Archive for January 22, 2012

ট্রাভেল লগ ৫: ফুকেট ডে ৪ (জেমস বন্ড আইল্যান্ড)

হোটেলের রিসেপসনে বসে আছি। আজকের পিক-আপ ৮ টায়। মিনিট দশেক হাতে আছে। এই ফাকে হোটেলের বেশ কিছু ছবি তুললাম। সকালের আলোয় ছবি সবচেয় ভালো আসে। ভালো কিছু শট পেলাম। শেষ হতে হতেই গাড়ি চলে এসেছে। গন্তব্য পিয়ার। আজকে যাচ্ছি ফাং নাগা বে (Phang Nga Bay)। পিয়ার (Pier) থেকে স্পিড বোটে উঠবো। যাবার পথের রাস্তাটা আনারস বাগানের মধ্যে দিয়ে। দু-পাশে সারি সারি আনারস ধরে আছে। পিয়ারে যাবার পর জামায় কালকের মতই স্টিকার লাগিয়ে দিল। টনি (Tony) লিখা গোলাপি রঙের স্টিকার। কারণ আমাদের গাইডের নাম টনি। জিগ্যেস করলো কোন দেশের। বাংলাদেশ শুনে সালাম দিল। পিয়ার বোট লেগুণ মারিনার মত না। লেগুণ থেকেই স্পিড বোটে উঠা যায় না। পিয়ার থেকে স্পীড বোট পর্যন্ত প্রায় আধা মাইল। লম্বা একটা জেটি ধরে হেটে বা ভ্যানে যেতে হয়। একটা ভ্যানে করে কিছু মানুষ গেল। আমরা বাকিরা হেটেই গেলাম। এই স্পিড বোট কালকের মত না। আরো বড় আর একটু পুরনো। কোনও সিট নেই। বোটের চারপাশে বেঞ্চের মত জায়গায় সবাই বসে। প্রথমে যাচ্ছি জেমস বন্ড আইল্যান্ড।



যাবার পথটা কালকের মতই। সাগরের মাঝে খন্ড খন্ড পাহাড়। মাঝে একটা জায়গায় একদল চিল চোখে পড়ল। আমাদের বোট ঘিরে চক্কর খেতে থাকলো। কাছেই হিত ওদের ডেরা। জেমস বন্ডে পৌঁছে বোট থেকে নামলাম। চিকন একটা কনক্রিটের করিডোর দিয়ে হেটে যেতে হবে বাম দিকে। তার পর দিনে মোড় নিয়ে সোজা এগোলেই চোখে পড়ে অন্য রকম দুটো পাহাড়। দুটো পাহাড়ের পাশাপাশি আর পুরোপুরি সমতল দুই পাশ প্রায় ৩০ ডিগ্রী কোনে আর শখানেক ফুট উপরে একে অপরের সাথে হেলান দিয়ে লেগে আছে। প্রাকৃতিক কোনও পাহাড়ের পাশ এতটা সমতল কখনো দেখিনি। জেমস বন্ড দ্বীপটার আসল নাম না, আসল নাম খাও ফিং কান (Khao Phing Kan)। যার মানে হচ্ছে: “Hills leaning against each other”। হয়ত এই আজব পাহাড়ের কারণেই এই নাম। ১৯৭৪ সালে মুক্তি পাওয়া জেমস বন্ডের ম্যান উইথ দ্যা গোল্ডেন গান ছবির শুটিং হয়েছিল এখানে। তারপর থেকে খাও ফিং কান নামটা হারিয়ে যাচ্ছে।

খাও ফিং কান

একটু সামনে এগুতেই পড়ল বিখ্যাত জমস বন্ড রক। প্রায় গোল করে ঘিরে রাখা সাগরের পানির ঠিক কেন্দ্রে বেলন আকৃতির এক খন্ড পাথর। যার নিচের অংশটা সরু হয়ে সাগরে মিশেছে। যদিও পাথরটার আসল নামে কো তাপু (Ko Tapu)। নামটা এখন স্থানীয় লোকজনও ভুলতে বসেছে। এটা দেখার পর যে কারো মনে হবে জেমস ক্যামেরন এভাটার মুভির ফ্লোটিং মাউন্টেনের আইডিয়া এখান থেকেই মেরেছেন। হয়ত আসলেই তাই।

কো তাপু
কো তাপু
কো তাপু

মানুষজন এই রকে হেলান দেবার ভঙ্গিতে দাড়িয়ে জেমস বন্ডের মত দাড়িয়ে ছবি তুলছে। হাতে অদৃশ্য পিস্তল। দেখতে ভালই লাগছে। ডান দিকে বাঁশ আর শনের তৈরি সুভেনির মার্কেট। বাম দিকে সরু পাহাড়ের উঠার রাস্তা। বেশ খানিকটা উঠলে রকটার ভালো কিছু ভিউ পাওয়া যায়। ছবি তোলার জন্য ভালো জায়গা। যদিও পাথরের সিরির মত উপরে উঠার রাস্তাটা মোটেও সুবিধার না। বেশ চাপা, পাশাপাশি দুজন দাঁড়ানো যায় না। তার উপর ঝরনার পানিতে ভেজা। বেশ ভয়ে ভয়ে উঠলাম। না আবার পা পিছলে পরি। এখান থেকে জেমস বন্ড রকের আরেকটা ভিউ পাওয়া যায়। উপরে উঠে বড় একটা পাথরের উপর অল্প একটু দাঁড়ানোর জায়গা। এক দম্পতি এসেছে দুই টিনেজার মেয়েকে নিয়ে। উদ্দেশ্য বিকিনি ফটোসেশান। যথেষ্ট সময় নিয়ে ফটোসেশান হচ্ছে। সিরিতে লম্বা লাইন পড়ে গেছে। এরা সরার নাম করছে না। এত কঠিন পথ পারি দিয়ে এসেছে, এত জলদি সরার কথাও না।

সুভেনির মার্কেট

ছবি তোলা নিয়া মহা ঝামেলার মধ্যে পরেছি। গতকাল মায়া বে তে গিয়ে পড়েছিলাম এক ঝামেলায়। আমার স্ত্রীর নাকি অনেক দিনের শখ বীচের ঠিক মাঝে, সাগরের সামনে দাড়িয়ে আমাদের দুজনের ছবি তোলা। শুধু মাঝে দাঁড়ালেই চলবে না। আমাদের বাম আর ডান দিকের পাহাড়ের মাঝে যেই ফাকা জায়গাটা আকাশ আর সাগর ভাগাভাগি করে নিয়েছে, আমরা দাড়িয়ে থাকব সেখানে। এছাড়া আমাদের মাথার উপর পাহাড়ের চূড়া আর পায়ের নিচে বীচের ধবধবে সাদা বালি থাকলেই চলবে। সমস্যা হচ্ছে ব্যাপারটা ও আমাকে আগে বলেনি তার উপর আমি tripod হোটেলে ফেলে এসেছি। কাউকে দিয়ে বড়জোর ছবি তোলানো যায় কিন্তু এরকম জটিল জ্যামিতিক সমীকরণের ছবি তোলানো প্রায় অসম্ভব। তাও যদি ওরা ভালো ইংরাজি বুঝত। কপাল বেশ ভালো ছিল বলতে হবে। ঢাকা থেকে আসা এক ভদ্রলোককে পেয়ে গিয়েছিলাম। মিনিট খানেক বুঝিয়ে ছবিটা তোলা গেছে। কিন্তু আজকে পরলাম আরো বড় সমস্যায়। আজও ভোরে বের হতে হবে বলে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়েছি। আবার সকালে উঠেই বের হয়ে গেছি। তারাহুরোর মাঝে ক্যামেরা চার্জ দিতে ভুলে গেছি। জেমস বন্ড আইল্যান্ডে পৌঁছানোর পরই ক্যামেরা লো ব্যাটারির সাইন দিচ্ছে। মনে হচ্ছে পুরো দুই সপ্তা ক্লাস বাং মেরে হাজির হবার পর শুনছি আজকে মিড-টার্ম। ফ্যাকাল্টিও সুবিধার না। মেক-আপ নেবে না।

বোটে উঠার সাথে সাথেই চার্জ শেষ। অনেকের সাথেই DSLR আছে। কারো কারো সাথে চার্জারও থাকতে পারে। জিজ্ঞেস করা শুরু করলাম। ভাগ্য এবারও বেশ ভালই বলতে হবে। আমাদের সাথে ক্রোয়েশিয়ার এক দম্পতি যাচ্ছে। ওদের ক্যামেরাও Canon 500D। কি জন্য খুঁজছি শুনল। ভদ্রলোকের কাছে চার্জার না থাকলেও এক্সট্রা ব্যাটারি আছে। ওটাই দিয়ে দিল।

তারপর গেলাম Panyee Island। একটা মুসলিম গ্রাম। সাগরের মাঝে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন। একটা বড় পাহাড় ঘিরে গ্রামটা। পুরোটাই কাঠের পাটাতনের উপর। এমন না যে পানির অনেক উপরে। যেকোনো বড় জোয়ারে গ্রামটা নিশ্চিত ভাবেই ডুবে যায়। পুরো গ্রামটা ঘুরে দেখালাম। বড় একটা বস্তি বলা চলে। মানুষজন বেশ গরিব, সেই সাথে ধার্মিকও। বয়স্ক পুরুষেরা সবাই টুপি পড়ে আছে। কোন দোকানে কেউ মদ বা বিয়ার বিক্রি করে না। গ্রামের মাঝে বড় উঠানের পাশে একটা স্কুল। একটা ক্লাসে টিচার নেই। টুরিস্ট দেখে ক্লাসের বাচ্চাগুলো আমাদের দিকে ফিরে, জানালা দিয়ে Michael Jackson এর নাচের ভঙ্গিতে পোজ দিচ্ছে। ইংরেজি এস-এর মত শরীর বাকিয়ে, ডান হাত শরীরের সাথে ৪৫ ডিগ্রি কোনে, বাম হাত প্যান্টের বেল্টে। পিচ্ছিগুলো স্টাইলটা ঠিক মত ধরতে পারেনি। বাম হাত দিয়ে প্যান্টের জিপার খামচে ধরে আছে। মোটামুটি অশ্লীল ভঙ্গি।

Panyee Island
উঠানের পাশে স্কুল

দুপুরে Hong Island। লম্বা সময় এখানে কাটাব। প্রথমে লাঞ্চ, তারপর canoeing। সাগরের মাঝে বড় একটা লঞ্চের ডেকে খাবার ব্যবস্থা। খাবার পর লঞ্চের পেছন থেকে canoeing-এর নৌকায় উঠলাম। প্রতি নৌকায় ২/৩ জন করে। নৌকার মাঝি মজার মানুষ। অল্প বয়সী একটা ছেলে। বয়স বড়জোর ১৫-১৬ হবে। চেহারায় কঠিন জীবিকার ছাপ। ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংরেজিতে অনর্গল কথা বলে যাচ্ছে। চিকন একটা টানেলের মত প্রবেশ পথ দিয়ে গুহার ভিতর ঢুকলাম। নৌকায় বসেও মাথা নিচু করে ঢুকতে হয়। মাথার উপর এবড়ো থেবড়ো চোখা পাথর। একটু খোঁচা লাগলেই নিশ্চিত রক্তারক্তি। গুহার ভেতরটা অদ্ভুত, অদ্ভুত রকম সুন্দর। পাহাড়ের ভিতর গোলাকার একটা ফাকা জায়গা। মাথার উপর দিয়ে সরাসরি আকাশ দেখা যাচ্ছে না। তবে রোদের আলো ভালই আসছে। আলোর প্রতিফলনে পুরো জায়গাটা আলোকিত হয়ে আছে। মনে হচ্ছে আরেক পৃথিবীতে চলে এসেছি এক টানে। আলোর এমন খেলা এর আগে নিজের চোখে দেখিনি। বর্ণনা করার সামর্থ্য আমার নেই। দুঃখিত।

canoeing

Naka Island যাবার সময় Panak Island পাশ দিয়ে গেলাম। পাহাড়ে অনেক প্রাচীন গুহা। যেমনটা গতকালও দেখেছি। Naka Island-এ ঘণ্টা দুয়েক সময় কাটান। চমৎকার নিলো পানি আরে সাদা বালির সৈকত। তেমন ভিড়ও নেই। সৈকতে গাছের ছায়ায় সারিসারি কাঠের খাট পিছান। তবে একটা ভাড়া করা যাবেনা। জোড়া খাট ঘণ্টা প্রতি ভাড়া। যারা একলা ঘুরবে তাদেরও দুইটা ভাড়া নিতে হবে। একটা থাই নৌকা নোঙ্গর করা। বেশ সুন্দর দেখতে, আগে একটা ছবি তুলে নিলাম। ঘণ্টা খানেক সাতার কাটলাম। তারপর কাঠের খাটের উপর আয়েশ করে শুয়ে থাকা। আহা! কি আনন্দ!

Naka Island
থাই নৌকা

পিয়ারে ফিরতে ১০ মিনিটও লাগলনা। গাড়িতে করে হোটেলে পৌঁছে ছোট একটা ঘুম। রাতে শেষ বারের মত পাতং বীচ দেখতে বের হলাম। চার দিন কেটে গেছে টানের উপর। টেরও পাইনি। খুব বেশি ঘুরাঘুরি করলাম না। ভোর ৪ টায় বের হতে হবে ঠিক ৭ টায় ফ্লাইট। ভোরের অন্ধকারে এয়ারপোর্ট যাবার সময় বুঝলাম, কতটা যত্ন পায় এই বীচ। এই অন্ধকারে ঘষেমেজে রাস্তাঘাট পরিষ্কার করছে মানুষজন। আবছা আলোয় শেষ বারের মত আরেকবার দেখে নিলাম বীচটা। Good bye Patong, Hope to see you again………



Phuket (ফুকেট), Travel log (ট্রাভেল লগ) , , , , , , , , , , , , , , , , , , No comments

অনিন্দিতা ৪

সন্ধ্যা থেকে এসপিজি-র (SPZ) পাশের টুলে বসে আছে অর্ণব। মন খারাপ থাকলে এখানে চলে আসে সে। পিঠটা পাঁচের মত বেকে আছে দুপা সামনে ছড়ানো। দেখে মনে হচ্ছে না টুলে বসে আছে, যেন মোটা ফোমের কোন আরামদায়ক সোফায় গা এলিয়ে দিয়েছে। শুধু একটাই পার্থক্য। আরাম করে সোফায় বসলে চেহারা সুখী সুখী থাকে। এখন চেহারায় দুখী দুখী ভাব।

এই জায়গাটা তাদের কাছে ঢাকা ভার্সিটির টিএসসি মত। এনএসইউ-র ক্যাম্পাস যখন বনানীতে ছিল, এসপিজিতে ক্লাস হত। এসপিজি-র পাশের বিল্ডিংগুলো গুলোর দেয়াল ঘেঁষে শুরু হয় ছোট ছোট টং দোকান। ঠিক টং দোকানও বলা যায় না। দেয়ালে পেরেক ঠুকে কলা, রুটি, কেক, বিস্কুট ঝুলানো থাকে। সামনে ষ্টোভে চা আর গরম পানি বসানো থাকে। আর পুরানো সিমেন্টের ব্যাগে সিগারেটের প্যাকেট। ক্লাসে যাওয়া আগে আর ক্লাস থেকে ফেরার পর ছেলেপেলেদের একটু রিফ্রেশমেন্ট।

এনএসইউ-র ক্যাম্পাস অনেক আগেই বসুন্ধরা চলে গেছে তবে যারা বনানীতে পড়েছে তাদের কাছে এটাই নর্থ সাউথ। এখনো অফিসের পরে সন্ধ্যা থেকে রাত তক একে একে হাজির হয় বিভিন্ন ব্যাচের পোলাপান। কখনো আড্ডা চলে মাঝ রাত পর্যন্ত।

কি মামা মন খারাপ?
সামনে রতন দাঁড়িয়ে আছে। ছেলেটা ৫-৬ বছর বয়স থেকে এখানে থাকে। হাতের ব্যাগে রেখে সিগারেট বিক্রি করে। একটা সময় মায়া মায়া চেহারা ছিল। এখন বেশ বড় হয়ে গেছে। চেহারায় পুরুষালি কাঠিন্য চলে এসেছে। রাস্তা ঘাটে পরে থাকা ছেলেপেলে তাড়াতাড়ি বড় হয়। জীবন এদের বেশিদিন ছোট থাকতে দেয়না। ভালো করে হাটতে শেখার আগে বিড়ি-সিগারেট ফুঁকতে শেখে। জ্ঞান-বুদ্ধি হবার আগে উপার্জন করতে শেখে।

না মন খারাপ না।
নেন বেনসন ধরান।
নাহ! সিগারেট খাব না।
নেন খান। টেকা লাগবনা। বেনসন ধরান। লম্বা টান দেন। মন ভালো হয়া যাইব।
কথা শুনে হেসে ফেলল অর্ণব।
দে সিগারেট দে। এক কাপ চা দিয়া যাইস।
আইচ্ছা।

সোজা হয়ে বসে সিগারেট ধরাল অর্ণব। লম্বা টান দিয়ে ধোয়া ছাড়ল মুখ গোল করে। অর্ণব জানে সে খুব সাদাসিধে মানুষ। মনের ভাব লুকানো তার পক্ষে সম্ভব না। যে কেউ দেখেই বুঝে তার মন ভালো না খারাপ। এই রতনও তাকে দেখে বুঝে ফেলেছে তার মন খারাপ। দুনিয়া সাদাসিধে মানুষের জায়গা না, এটা সে বুঝে। তবে বুঝেও কোন লাভ হয়নি। অভিনয় করে অনুভূতি আড়াল করা সে শেখেনি। এমন আরও অনেক কিছুই সে শেখেনি।

রাত ১০ টা পর্যন্ত এসপিজি-র পাশেই বসে থাকলো অর্ণব। অনেক দিন পর অনেকের সাথে দেখা হল। ভালো আড্ডাও হল। মন খারাপ ভাবটাও চলে গেছে। বেশিক্ষণ মন খারাপ করে থাকাও আসলে সে শেখেনি। ১০ টার সময় ক্লাব জিলাটো থেকে ফোন আসলো। স্যার আপনি একটা কেক অর্ডার করেছিলেন। সন্ধ্যায় নেবার কথা ছিল। আমাদের দোকান ১১ টায় বন্ধ হয়। আজকে ডেলিভারি নিলে কাইন্ডলি ১১ টার মধ্যে নেবেন।

স্পিটফায়ারের বুকিং ক্যানসেল করা হয়েছে। বানিয়ে ফেলা কেইকের অর্ডার ক্যানসেল করা যায়না। এই কেইক দিয়ে সে কি করবে বুঝতে পারছে না। বাসায় নিয়ে লাভ নেই। মায়ের ডায়াবেটিস কেইক খেতে পারবে না। কেইক জিনিসটা তার নিজেরও খুব একটা পছন্দ না।

সামনে পানির গ্যালনের উপর রতন বসে আছে। সারাদিনের বেচা-বিক্রি বিক্রি শেষে টাকার হিসাব করছে। অর্ণব ডাকল।
রতন এই দিকে আয়।
কন মামা।
কেইক খাবি?
খামু।
আয় আমার সাথে।

জিলাটো থেকে কেইক দিয়ে রতনের হাতে দিয়ে বাসায় যাওয়ার জন্য সিএনজি নিলো। মা অস্থির হয়ে গেছে। সন্ধ্যা ৭ তার মধ্যে সে বাসায় না ফিরলে তার মা উদ্বেগ নিয়ে ফোন করে। বাসায় ফেরার আগ পর্যন্ত প্রতি ঘণ্টায় ঘণ্টায় ফোন করে। প্রতি বার একই প্রশ্ন। বাসায় কখন ফিরবি? সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে উদ্বেগ বাড়ে। শেষের দিকে তার গলা কাপতে থাকে। আগে এমন ছিল না। বাবা মারা যাবার পর থেকে এমন শুরু হয়েছে। সন্ধ্যার পর ছেলে বাসায় না থাকলে তিনি অস্থির হয়ে উঠেন।

অর্ণব বাসায় ফিরল বারটার একটু আগে। ফিরজা বেগম অস্থির হয়ে মোবাইল হাতে নিয়ে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে ছিলেন। ঠিক বারটায় আবার ফোন দিবেন। তার আগেই ছেলে চলে এসেছে। কলিং বেল শুনেই বুঝলেন ছেলে এসেছে। ছেলেটা এমনিতে শান্তশিষ্ট তবে ঘরের দরজায় বাইরে অধৈর্য হয়ে যায়। এক নাগাড়ে বেল দিতে থাকে। দরজা খোলার আগ পর্যন্ত। ঢংঢং, ঢংঢং, ঢংঢং, ঢংঢং……। একবার তারা কেউ বাসায় ছিলেন না। অর্ণব একটানা দশ মিনিট বেল চেপে কলিং বেল জ্বালিয়ে ফেলেছিল।



অনিন্দিতা, উপন্যাস , , No comments

অনিন্দিতা ৩

নিজের ঘরের দরজা খুলেই অনিন্দিতা বুঝল কেউ এসেছিল। তার ঘর সে নিজেই গুছায়। বুয়াদের এই ঘরে ঢুকার অনুমতি নেই। দরজায় দাঁড়িয়ে পুরো ঘরে চোখ বুলিয়ে নিলো। যদিও ঘরের সব কিছুই ঠিকঠাক তবুও বুঝতে পারছে বাইরের কেউ ঢুকেছিল। ড্রেসিং টেবিলে ব্যাগ রেখে বাথরুমে ঢুকল। হাত ধুতে হবে। যেহেতু কেউ একজন ঘরে ঢুকেছিল, খুব সম্ভবত দরজার হাতলটা হাতও রেখেছে। হাত রাখলে হাতলে অবশ্যই হাতের ঘাম লেগেছিল। এখন সে ঘাম এখন তার হাতে লেগেছে।

অনিন্দিতা বেশ সময় নিয়ে হাত ধোয়। প্রথমে হাত ভিজিয়ে হাতে সাবান মাখায়। ঠিক এক মিনিট ধরে ফেনা তোলে। তারপর আরেকটু সাবান নিয়ে হ্যান্ড ওয়াশের টিপে আর কলের মাথায় লাগায়। তারপর হাত ভালো করে ধোয়। এরপর কলের মাথা আর হ্যান্ড ওয়াশের বোতলটা ধোয়। সবশেষে আরেকবার পানি দিয়ে হাত ধোয়। হাত ধোয়া শেষে দুহাত বেসিনের উপর ধরে রাখে যতক্ষণ না হাত থেকে শেষ পানির ফোটাটা ঝরে। তারপর টিস্যু পেপারে হাত মুছে নেয়।

বাথরুম থেকে বেড়িয়ে অনিন্দিতা খাটের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তীক্ষ্ণ নজর বুলাল সারা খাটে। বাম দিকের কোনাটা খানিকটা কুঁচকে আছে। দুহাতে টেনে টানটান করে ফোমের ভেতর ঢুকিয়ে দিল। তারপর গেল ড্রেসিং টেবিলের দিকে। না সব ঠিক আছে টেবিলে। তারপর গেল ডান দিকের ওয়ালে ঝোলান নিজের বড় ছবিটার দিকে। কেউ ধরেছিল ফ্রেমটা। সামান্য বেকে আছে। ফ্রেমটা ঠিক করে একটু পেছনে এসে দেখল অ্যাঙ্গেলটা ঠিক আছে কিনা। না এবার একটু বায়ে চলে গেছে। তিন চার বারের চেষ্টায় সন্তুষ্ট হল। এবার ঠিক আছে।

ড্রেসিং টেবিলে রাখা সেনিটাইজার টিস্যু নিয়ে দরজার হাতলটা ভালো করে মুছল। কাজ শেষে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। সবকিছু ঠিকঠাক আছে এখন।

ঘর থেকে বেড়িয়ে মাকে ডাকল। রান্না ঘর থেকে জবাব আসলো। দ্রুত পায়ে রান্না ঘরের দিকে গেল।

অনিন্দিতার মা চিন্তিত মুখে চুলার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। চুলায় দুধ জ্বাল হচ্ছে। তিনি পুডিং বানাতে গিয়ে সমস্যায় পড়েছেন। তিনি অসাধারণ পুডিং বানাতে পারেন। কাউকে দাওয়াত করলে প্রসন্ন গলায় জিজ্ঞেস করে, ভাবি পুডিং থাকছে তো? অথচ গত দুইবার সব প্যাচ লেগে গেছে। পুডিং জমছে না। উপরে নরম থাকছে আর নীচে পুড়ে যাচ্ছে আবার স্বাদ ঠিক আছে। সমস্যাটা কোথায় তিনি ধরতে পারছেন না। এমন হবার কথা না। আজ বাজার থেকে হাসের ডিম আনিয়েছেন। হাসের ডিমে পুডিং শক্ত হয়।

দরজায় দাঁড়িয়ে অনিন্দিতা জিজ্ঞেস করলো।

আমার ঘরে কেউ ঢুকেছিল?
না।
কেউ এসেছিল বাসায়?
ওহ! তোর বড় ফুপু এসেছিল।

বড় ফুপু অনিন্দিতাকে ভীষণ পছন্দ করে। তিনি বাসায় এলে অনিন্দিতার মুখে হাত বুলিয়ে আদর করেন। সে বাসায় না থাকলে তার বেডরুমে ঝুলান ছবিটায় হাত বুলিয়ে আদর করেন। মানুষের ভালবাসার প্রকাশ বিচিত্র। যার প্রতি ভালবাসা সে সামনে না থাকলেও প্রকাশ থামে না।

আম্মু আমাকে এক কাপ চা দাও। আমার রুমে যেতে না করবে। বারান্দায় দিতে বোলো।

এই বাড়িতে এক ডজন কাজের লোক থাকলেও করা বারনে তারা কখনই অনিন্দিতার ঘরে ঢুকে না। তারপরও সে কিছু দিতে বলে প্রতিবারই তার ঘরে যেতে বারণ করবে।



অনিন্দিতা, উপন্যাস , , No comments

অনিন্দিতা ২

ঢাকা শহরে জ্যাম গিট্টুর মত গেলে থাকে। বৃষ্টি হলে আন্ধা গিট্টু লাগে। এই আন্ধা গিট্টুর মধ্যে সিএনজিতে বসে আছে অর্ণব। মনে হচ্ছে ফার্মগেটের মোড়ে সব থেমে আছে। নড়াচড়ার লক্ষণ নেই। বেশীর ভাগ গাড়ি স্টার্ট বন্ধ করে বসে আছে। এখন বাজছে সোয়া ৫ টা। সাড়ে ৫ টার মধ্যে কোন ভাবেই গুলশান পৌঁছান যাবে না। এমনিতে তার সময় জ্ঞান খুব একটা সুবিধার না। তবে অনিন্দিতার সাথে দেখা করতে গেলে সময়মতই যাবার চেষ্টা করে। আজ ফুল আনতে শাহাবাগ গিয়ে দেরি করে ফেলেছে। এতো সময় লাগতে পারে মাথায় আসেনি।

আগে বৃষ্টি হলে গরম কমতো, এখন বাড়ে। তাও আবার ভ্যাঁপসা গরম। সারা গা ঘামে চিটচিট করছে। মাথাও ভালোই ধরেছে। এই মুহূর্তে গরম এক কাপ চা খেতে পারলে ভালো লাগত। সে উপায় নেই। এভাবে বেশিক্ষণ থাকলে মাথা ধরা আরও বাড়বে। বেশী মাথা ধরলে তার বমি পায়। মুখভর্তি করে বমি করার পর খানিকটা আরাম হয়।

মাথা ধরা কমানোর জন্য কপালের ২ পাশে আঙ্গুল দিয়ে চেপে ধরল। মাঝে মাঝে এভাবে খানিকটা আরাম পাওয়া যায়। বমি এসে গেলে সমস্যা। বড় একটা লোক বমি করলে সবাই কৌতুক চোখে তাকায়। কোন এক অদ্ভুত কারণে মানুষের ধারনা বমি করবে ছোটরা বা মেয়েরা। রাস্তাঘাটে ছেলেদের বমি করার অধিকার নেই। সিএনজি থেকে নেমে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারলে ভালো হত। সে উপায়ও নেই। রাস্তায় মোটামুটি হাঁটু পানি।

একে একে সব গাড়ির ইঞ্জিন স্টার্ট নিচ্ছে। সিগনাল খোলার একটু আগে এই শব্দটা বেশ উত্তেজনাকর। স্থবির হয়ে পরে থাকা গাড়িগুলোর মধ্যে হুট করে ভর করে এক অদ্ভুত চঞ্চলতা। তন্দ্রাচ্ছন্ন রাস্তাগুলো যেন হুস ফিরে পায় ক্ষনিকের জন্য। আর গাড়ির ভেতর বাক্সবন্দী মানুষগুলো মনের মধ্যে সম্ভাবনার অঙ্ক কষে। পরের সিগনালের আগে ঠিক কতটা পথ যাবে। আস্তে আস্তে সামনের গাড়িগুলো আগাতে থাকলো। এমন সময় তার সিএনজির স্টার্ট বন্ধ হয়ে গেল। আশে পাশের সব গাড়ি চলছে। তারটা থেমে আছে। বিরক্তিকর অবস্থা।
কি হইসে মামা?
মনে অয় ইঞ্জিনে পানি ঢুকসে। একটু গরম হইলে ঠিক হয়া যাইব।
ড্রাইভার এক নাগারে স্টার্ট দেবার চেষ্টা করে যাচ্ছে। মিনিট খানেক পর বিরতি দিল। সিএনজিটা টেনে ফুটপাথের পাশে দাড় করাল।

মোবাইল বাজছে। অনিন্দিতার ফোন। অর্থাৎ সাড়ে ৫ টা বেজে গেছে।
তুমি কোথায়?
কাওরান বাজার।
ওটা কোথায়? মানে তুমি কতটুকু এসেছ?
ঢাকা শহরের বেশীরভাগ জায়গাই অনিন্দিতা চেনে না। তার শহর ধানমণ্ডি, গুলশান আর বারিধারায়। বাকি জায়গার হিসাব দূরত্ব দিয়ে হয়।
রাস্তার হিসাবে অর্ধেকের একটু কম।
এখন তো সাড়ে ৫ টা বাজে। তুমি আর কখন আসবে?
দেরি হবে, ভালো দেরি হবে।
এক কাজ করো। আজকে বাদ দাও।
তোমার কি খুব তাড়া আছে?
না। তা নেই। তবে এতক্ষণ বসে থাকতে ইচ্ছে করছে না। কালকে না হয় বেরুব?
আচ্ছা। ঠিক আছে।

অর্ণবের মনটা খারাপ হয়ে গেছে। অসম্ভব খারাপ। আজকে একটা বিশেষ দিন। তাদের সম্পর্কের তৃতীয় বার্ষিকী আজ। অথচ অনিন্দিতা ভুলে গেছে। অবশ্য মনে রাখবে এমনটা আশাও অর্ণব করেনি। প্রেমের প্রথম ২/১ বছর মানুস ঘটা করে দিনক্ষন মনে রাখে। কবে প্রথম দেখা হয়েছে, কবে প্রথম একসাথে ডেটিং-এ গিয়েছে, কবে প্রথম হাত ধরেছে। তারপর ধীরে ধীরে ভুলে যায়। ঠিক যেমন ফাইনাল এক্সাম দেয়ার পর খুব দ্রুত কি পড়েছি যাই। তবে অর্ণবের সব মনে আছে। সে বেশ রোমান্টিক ছেলে।

খুব আয়োজন করে দিনটা শুরু করেছিল। আসলে দিনটা না। পুরো সপ্তাটাই খুব আয়োজন করে শুরু করেছিল। গাজীপুর থেকে ৩০ টা মেরুন রঙের তাজমহল গোলাপ আনিয়েছে। একেকটা টেনিস বলের সাইজ। তার সব বন্ধুদেরকে দাওয়াত দিয়েছে। স্পীটফায়ারে সারপ্রাইজ পার্টির বুকিং দেয়া হয়েছে। সন্ধ্যার পর একটা রুম আলাদা করে সাজিয়ে রাখা হবে। ক্লাব জিলাটোটে ৩ কেজির কেইক অর্ডার করা হয়েছে।

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মোবাইলটা বের করলো। যাদের দাওয়াত দিয়েছে সবাইকে না করে দিতে হবে। একবার ভেবেছিল মনে করিয়ে দেবে অনিন্দিতাকে। তাহলে সে অবশ্যই অপেক্ষা করত। কেন যেন তাও আর ইচ্ছে হচ্ছে না। কাউকে দিয়ে ইচ্ছের বাইরে কিছু করাতে হয় না।



অনিন্দিতা, উপন্যাস , , No comments