Archive for June 29, 2012

আষাঢ়ে গল্প

প্রেস ক্লাবের বড় হল ঘরটা অনেক আগেই ভরে গেছে। যারা একটু পরে এসেছে। তারা পিছনে দাঁড়িয়ে আছেন। ১০ টা বাজতে এখনো ৫ মিনিট বাকি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর ১০ টায় আসবার কথা। যদিও মন্ত্রী এমপিরা ১০ টায় খুব গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান না থাকলে ১১ টার আগে বাসা থেকে বের হন না। কিন্তু এই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী ব্যতিক্রম। ১০ টায় আসার কথা থাকলে মিনিট পাঁচেক আগে আসবেন পরে না। প্রতি মাসের প্রথম রবিবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী আনুষ্ঠানিক ভাবে সাংবাদিকদের সামনে আসেন। অল্প শব্দে প্রশ্নের উত্তর দেন। সব প্রশ্নের যে উত্তর দেন তাও না। চমৎকার ভাবে হাসি মুখে এড়িয়ে যান। অবশ্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী সব সময় হাসি মুখেই থাকেন। তার হাসিটা অন্যরকম। ফাস্ট ইয়ারের স্টুডেন্টের প্রশ্ন শুনে বড় প্রফেসর যে ভাবে হাসেন তিনিও সে ভাবেই হাসেন।

আজকের সংবাদ সম্মেলন বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। পরশু রাতে বাণিজ্য মন্ত্রীর ছেলেকে বাসা থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অভিযোগ তেমন গুরুতর কিছু না। বেচারা বাবার ট্যাক্স ফ্রি কোটায় কেনা গাড়িটা একটু জোরে চালাচ্ছিল। সিগনাল না মেনে যাওয়ার সময় একটা রিক্সাকে ধাক্কা মারে। রিক্সার যাত্রী প্রতিবাদ করায়, গাড়ি থেকে নেমে একটা চড় লাগিয়ে দেন। সামনে দাঁড়ানো পুলিশ সার্জেন্ট এগিয়ে এলে তাঁকেও একটা চড় দিয়ে চলে যান। ৫ মিনিটের মধ্যে ওই যাত্রী মামলা করেন। মামলা করা মোটেও কঠিন কাজ না। এখন ইন্টারনেট থেকে সহজেই মামলা করা যায়। পুলিশের ঘুস খেয়ে মামলা না নেবার দিন শেষ। মামলা করার সাথে সাথে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিষয় বস্তুর উপর ভিত্তি করে একজন তদন্ত কর্মকর্তার উপর মামলার ভার চলে যায়। তাঁকে যথা সময়ে তা তদন্ত করতে হয়। পুরো বিষয়টি পুলিশ হেড কোয়ার্টার থেকে মনিটর করা হয়। কোথাও কিছু আটকে থাকলে সাথে সাথে ব্যবস্থা নেয়া হয়। রাজধানীর প্রতিটি রাস্তায় হাই ডেফিনেশান ক্যামেরা আছে, অল্প দিনের মধ্যে দেশের সব রাস্তায় বসে যাবে। ভিডিও ফুটেজ দেখে ঘটনার প্রমাণ পাওয়া গেছে, সেই সাথে গাড়ির নম্বরও। বাণিজ্য মন্ত্রীর ছেলেকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

এই দেশে মন্ত্রী এমপিরা এবং তাদের আত্মীয়-স্বজন চূড়ান্ত ক্ষমতার অধিকারী। যে কাউকে চড় থাপ্পড় তারা মারতেই পারেন। তাই বলে গ্রেফতারের ঘটনা ঘটবে কেউ কল্পনাও করেনি। তার উপর বাণিজ্য মন্ত্রী খাইরুল কবির সরকারি দলের সিনিয়র নেতাদের একজন। পুরো রাজশাহী বিভাগে তার চেয়ে বড় নেতা সরকারি দলে নেই। মাত্র ১২ ঘণ্টার নোটিশে হাজার পঞ্চাশেক লোকের মিছিল বের করতে পারেন। হরতালের দিনে তিনি রাস্তায় বেরোলে, সব কিছু বন্ধ হয়ে যায়। বিরোধী দলের নেতাকর্মীরাও ওনাকে যথেষ্ট তোয়াজ করে চলে। গ্রেফতারের সময় মন্ত্রী বাড়িতেই ছিলেন। বন্ধের দিনে তার বাসায় বড় পার্টি চলছিল। মন্ত্রী সাহেব আমুদে মেজাজে সবার মেহমানদারি করছিলেন। এমন সময় পুলিশ এসে এরেস্ট ওয়ারেন্ট দেখায়। সরকারের মন্ত্রী থেকে অনেক রাঘব বোয়ালের সামনেই পুলিশ তার ছেলেকে গ্রেফতার করে। ঘটনার আকস্মিকতায় তিনি বাকরুদ্ধ হয়ে যান।

৯ টা ৫৮ মিনিটে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী চলে এসেছেন। ঠিক ১০ টায় প্রশ্নোত্তর পর্ব শুরু হয়েছে। প্রশ্নর অধিকাংশই বাণিজ্য মন্ত্রীর ছেলে বিষয়ক।
প্রস্নঃ বাণিজ্য মন্ত্রীর ছেলের গ্রেফতারের কারণ?
উত্তর: জোরে গাড়ি চালান, রিক্সার যাত্রী এবং পুলিশ সার্জেন্টকে চড় মারা।
প্রস্নঃ মামলা কে করেছে, পুলিশ না ওই রিক্সার যাত্রী?
উত্তর: রিক্সার যাত্রী।
প্রস্নঃ আপনি নিজে একজন টেকনোক্রেট মন্ত্রী হয়ে এতো বড় একজন মন্ত্রী সেই সাথে এতো বড় একজন নেতার ছেলেকে গ্রেফতার করলেন। তাঁকে ছেড়ে দেবার জন্য আপনার উপর চাপ আসেনি?
উত্তর: প্রশ্ন করা যেমন আপনাদের অধিকার তেমনি উত্তর না দেওয়াও আমার অধিকার। আপনি আপনার অধিকার চর্চা করছেন। আমি আমার টা। আমি পরের প্রশ্নের জন্য অপেক্ষা করছি।
হলরুমের সব সাংবাদিক উচ্চ শব্দে হেসে ফেলল।

সরকারের বয়স ৩ মাস হয়নি। মন্ত্রিত্বের বয়সও না। তবে এর মধ্যেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী পুরো প্রশাসনে জোরে ঝাঁকি দিয়ে ফেলেছেন। এতো কম সময়ে এটা কি ভাবে হল সেটা একটা রহস্য। অবশ্য মোজাম্মেল রফিকের মন্ত্রী হওয়াটাই একটা রহস্য। বয়স মোটে ৪০। কোনদিন রাজনীতি করননি। শুধু তিনি নন, তার চোদ্দ পুরুষে কেউ রাজনীতি করেনি। পেশায় সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। তার মন্ত্রী হবার গল্পটা বেশ চমকপ্রদ। গতবছর একটা আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগ দিতে গিয়েছিলেন আমেরিকাতে। সম্মেলনের শেষ দিনে একটা বিশেষ অনুষ্ঠানে উন্নয়নশীল দেশের সরকারি প্রতিনিধিরা তাদের দেশের তথ্য প্রযুক্তির উন্নয়ন চিত্র তুলে ধরবেন সবার সামনে। সবদেশ আগে থেকে ব্যাপক প্রস্তুতি নিলেও বাংলাদেশ কিছুই করেনি। যদিও ৩ মাস আগেই তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ে ইমেইল পাঠান হয়েছিল। একদিন আগে সরকারি একজন আমলা বিষয়টি মোজাম্মেল রফিককে জানান। কিছু করা যায় কিনা দেখতে বলেন। সম্মেলনে আসা বাকি ৬ জন বাংলাদেশিকে নিয়ে মাত্র ২৪ ঘণ্টায় মোজাম্মেল রফিক অসাধারণ একটা উপস্থাপনা তৈরি করেন। যা দুনিয়ার তাবৎ বিশেষজ্ঞ আর নেতাদের বাংলাদেশ সম্পর্কে অন্য রকম ধারনা দেয়। অনুষ্ঠানে আরও অনেকের মত তৎকালীন বিরোধী দলীয়নেত্রী (বর্তমান প্রধানমন্ত্রী) উপস্থিত ছিলেন। মোজাম্মেল রফিকের কর্মদক্ষতা ও ব্যবস্থাপনায় তিনি মুগ্ধ হন।

দেশের যেকোনো মন্ত্রণালয়ের চেয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্যাপ্তি ও কাজের পরিধি অনেক বড়। পুলিশ, বিজিবি, রাব, আনসার, ভিডিপি, ইমিগ্রেসন, কোস্ট গার্ড এর মত গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাগুলো এই মন্ত্রণালয়ের আওতায়। যার বেশির ভাগই ২৪ ঘণ্টা কাজ করে। নির্বাচনে জয়ের পর প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রিত্ব ভাগাভাগির সময় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর পদে কাউকেই খুঁজে পাচ্ছিলেন না। অনেকটা হুট করেই মোজাম্মেল রফিকের কথা মাথায় আসে। ডেকে পাঠানোর পর প্রথমেই তিনি না বলে দেন। প্রধানমন্ত্রী তাঁকে ২ দিন সময় নিয়ে চিন্তা করতে বলেন। দুদিন পর শর্তসাপেক্ষে রাজি হন। খুবই সাধারণ শর্ত। তার কাজে কেউ হস্তক্ষেপ করবে না। প্রধানমন্ত্রী, আদালত ও সংসদ ছাড়া কারো কাছে তার কোন জবাবদিহিতা থাকবেনা। কোন কাজ পছন্দ না হলে পদত্যাগ করতে বলবেন। এর বাইরে কিছু না। এবং ঠিক এক বছরের মাথায় তিনি পদত্যাগ করবেন। প্রধানমন্ত্রী অবাক হয়ে প্রশ্ন করেন, এক বছর কেন? তিনি উত্তর দেন: একটা মন্ত্রণালয় ঠিক করতে এক বছরের বেশী লাগে না। দলের সবাই বিরক্ত এমন আনকোরা একজনকে মন্ত্রী বানানোয়। মন্ত্রী সভার প্রথম বৈঠকের সময় কোন মন্ত্রী তার সাথে কথা বলেনি।

শপথ নেবার পর দিন ঠিক সকাল ৯ টায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আসেন। মন্ত্রী হবার পর সরকারি গাড়ি নেননি। অফিসে এসেছেন সিএনজি-তে চড়ে। নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা ইতস্তত বোধ করছেন। তারা এসেছেন দামি পাজেরোতে চড়ে। মন্ত্রী এসেছেন সিএনজি-তে। শুধু তাই না। অফিসে আসার সময় রাস্তা বন্ধ করতেও নিষেধ করেছেন। সাহাবাগের সিগনালে ১০ মিনিট আটকে থেকেছেন। এতো সকালে অফিসে আসার অভ্যাস বেশির ভাগেরই নেই। মাত্র ৩০ ভাগ কর্মকর্তা ৯ টার ভেতর অফিসে এসেছে। তাদের নিয়েই প্রথম বৈঠক শুরু করলেন। বৈঠক বেশিক্ষণ হল না। ৫ মিনিটেই মন্ত্রী কাজ শেষ করলেন। বৈঠকের শেষে স্বরাষ্ট্র সচিব দলীয় কর্মকর্তাদের বদলির আর পদন্নোতির সুপারিশের ফাইল মন্ত্রীর দিকে এগিয়ে দিলেন। মন্ত্রী ফাইল হাতে নিলেন না। ছিঁড়ে ফেলতে বললেন। স্বরাষ্ট্র সচিব অবাক হয়ে মন্ত্রীর দিকে তাকিয়ে আছেন। এই সুপারিশগুলো কেন্দ্রীয় নেতারা দিয়েছেন। স্বয়ং অর্থমন্ত্রীর সুপারিশও এর মধ্যে আছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী বললেন, আপনি আমার কথা শুনতে পেয়েছেন। স্বরাষ্ট্র সচিব দেরি করলেন না। ফাইল ছিঁড়ে ফেললেন।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এখনো নির্বাচনের আমেজ কাটেনি। সরকারি দলের আমলারা বুক ফুলিয়ে চলছেন। গত পাঁচ বছর অনেকেই ওএসডি ছিলেন। তারাও আজকে মন্ত্রণালয়ে চলে এসেছেন। অন্যদিকে আগের সরকারের আমলের কর্মকর্তারা ওএসডি হবার ভয়ে চুপচাপ থাকছেন। তবে এই অবস্থা বেশিক্ষণ থাকল না। মন্ত্রী জানিয়ে দিলেন, দলীয় পরিচয়ে কেউ বদলি বা ওএসডি হবে না। গত ১০ বছরে কাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এসেছে আর প্রমাণিত হয়েছে সেই তালিকা করতে বলে বেরিয়ে গেলেন।

পুলিশ হেড কোয়ার্টারে আরও বড় শোরগোল উঠালেন। আইজি, এআইজিপি, ডিআইজি, এআইজি, এএসপি দের সাথে মিটিং অদ্ভুত ভাবে শুরু করলেন। সরাসরি প্রশ্ন করলেন।
মন্ত্রী: পুলিশের দুর্নীতির প্রধান কারণ কি?
কোন কর্মকর্তা এমন প্রশ্ন আশা করেনি। সবাই খানিক্ষন চুপ করে থাকলেন। অবশেষে আইজি বললেন রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ আর বেতন কাঠামো।
মন্ত্রী: কত বেতন হলে সবাই ঘুষ না খেয়েও থাকতে পারবে?
আইজিঃ বর্তমান বেতন কাঠামোর অন্তত দ্বিগুণ।
মন্ত্রী: আজকে থেকে পুলিশে কোন রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ হবে না। সেই সাথে কেউ দুর্নীতিও করতে পারবে না। ৬ মাস পরে সবার বেতন দ্বিগুণ করা হবে। এই ৬ মাসে যারা ঠিক মত দায়িত্ব পালন করবে তারা পুলিশে থাকবে।
আইজিঃ বাকিরা?
মন্ত্রী: বরখাস্ত হবে। এবার বলুন, আপনাদের কে কে আমার সাথে কাজ করতে প্রস্তুত আছেন।

মাত্র ৬ মাসে পুলিশ পাল্টে গেছে। রাস্তায় সার্জেন্ট বাস থামিয়ে কাগজ দেখার নামে ঘুষ খায় না। থানার এসআই তদন্ত রিপোর্ট বানাতে টাকা খায় না। মন্ত্রী এমপিরা তদবির করতে থানায় ফোন করেন না। ছাত্রদল বা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা পুলিশের সাথে দাপট দেখায় না। পুলিশের পুরো কার্যক্রম মনিটরিং করা হয়। মন্ত্রী কথা রেখেছেন। সবাই দ্বিগুণ বেতন পান।

অল্প কদিনেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সবার কাছে তুমুল জনপ্রিয় হয়ে গেলেন। তিনি অন্য মন্ত্রীদের মত কোন অনুষ্ঠানের উধবোধন বা বক্তব্য দিতে যান না। এখন পর্যন্ত সরকারি টাকায় বিদেশ সফরে যাননি। প্রতি সপ্তাতেই নতুন কিছুর জন্ম দেন যা কেউ কল্পনাও করেনি। সাংবাদিকেরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর খবর ছাপার জন্য আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করে। প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত আগ্রহ নিয়ে প্রতিদিন পত্রিকা দেখেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নতুন কি করল। এই দেশে প্রধানমন্ত্রী হওয়া সহজ কাজ না। দল সরকারে আসে ভোটের হিসাবে। দল আসে নেতা কর্মীদের হিসাবে। দল ঠিক রাখতে জেনেশুনে অনেক নেতাকে হাতে রাখতে হয়। অনেক দুর্নীতিবাজ লোককে ভালো পদে বসাতে হয়। এদের ছাড়া দল নিয়ন্ত্রণে থাকে না। দলের প্রধান আর প্রধানমন্ত্রী হিসাবে তাকে সব কিছু সামলাতে হয়। এই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গত কয়দিনে পনের জন সাংসদকে জেলে ভরে ফেলেছে। বেশ কয়জন সিনিয়র নেতা ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করেছেন। এ বিষয়ে কথা বলেছেন। এভাবে চললে দলে ভাঙ্গন ধরবে বলে নিশ্চিত করেছেন। অথচ এদের গ্রেফতারের কারণে সরকারের জনপ্রিয়তা নির্বাচনের সময় থেকে আরও বেড়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রতি সপ্তায় একবার প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করেন। মন্ত্রণালয়ের কাজের বিবরণ দেন। ১০ মিনিটের বেশি সময় থাকেন না। আজকে কাজ শেষ করে চুপচাপ বসে আছেন। প্রধানমন্ত্রী জিজ্ঞাস করলেন কিছু বলবে?
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীঃ প্রতিরক্ষা মন্ত্রীকে এরেস্ট করার অনুমতি চাচ্ছি।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রী শুধু মন্ত্রীই নন। সংসদে দলের চীফ হুইপ। দলের শীর্ষ নেতাদের অন্যতম। প্রধানমন্ত্রী খানিকক্ষণ চুপ থেকে জিজ্ঞেস করলেন, তার বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রমাণ কি পেয়েছ?
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীঃ জি। তিনি সত্যি সত্যিই সমরাস্র কিনতে ঘুষ নিয়েছেন।
আরও খানিকটা সময় নিয়ে গিজ্ঞেস করলেন, যদি অনুমতি না দেই?
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীঃ আমি পদত্যাগ পত্র সাথে নিয়ে এসেছি।
প্রধানমন্ত্রী হেসে বললেন তোমাকে অনুমতি দেওয়া হল। কখন এরেস্ট করবে?
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ঘড়ির দিকে তাকালেন। প্রধানমন্ত্রী জিজ্ঞেস করলেন ঘড়িতে কি দেখছ?
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীঃ এখন ঠিক ৩ টা বাজে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রীকে ৩ টায় এরেস্ট করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী: যদি অনুমতি না দিতাম?
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীঃ পুলিশ তার অফিস থেকে ফেরত আসতো। আমি ৩ টার মধ্যে ফোন না করলে তারা অভিযান শেষ করবে। নতুবা ফেরত আসবে। এমনটাই নির্দেশ দেওয়া আছে।

চলবে…………

দৃষ্টব্যঃ এই গল্প ভবিষ্যতের। আমাদের স্বপ্নের কোন এক ভবিষ্যতের। যে ভবিষ্যতের স্বপ্ন আমরা বুকে লালন করি না। সেই ভবিষ্যত কখনই আমাদের সামনে বাস্তব হয়ে আসবে না। হোকনা স্বপ্নটা আষাঢ়ে গল্প।



আষাঢ়ে গল্প, গল্প 15 comments

অনিন্দিতা ৫

সকালে ঘুম থেকে উঠে ফ্যামিলি লাউঞ্জের সামনের বারান্দায় বসে আছে অনিন্দিতা। শূন্য দৃষ্টিতে বাগানের দিকে তাকিয়ে আছে। ঠিক ৬ টায় ঘুম থেকে উঠে সে, রাতে যখনই ঘুমাক। পরের পাঁচ মিনিট চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকে। তারপর বাথরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়। পরপর তিন বার মুখে ঠাণ্ডা পানির ঝাপটা। তারপর বেসিনের উপর দুহাতে ভড় দিয়ে এক মিনিট স্থিরভাবে আয়নার দিকে তাকিয়ে থাকে। তোয়ালে মুখ মুছে বারান্দায় এসে বসে। সোয়া ছয়টায় এক মগ ব্ল্যাক কফি খায়। সাথে চিনিও থাকে না। সাড়ে ছয়টায় নাস্তা করতে যায়। এতো সকালে আর কেউ নাস্তা করে না। সে একাই করে। দেশে থাকতে গত পাঁচ বছরে এই নিয়মের ব্যতিক্রম হয়নি।

কফি চলে এসেছে। হাসেম নিঃশব্দে এসে সাবধানে ট্রে থেকে কফির মগ টেবিলের উপর রেখে চলে গেছে। যেন হাসপাতালের আইসিইউ-র সামনে এসেছিল। সকাল সাতটার আগে কারো সাথে কথা বলে না অনিন্দিতা। এই বাড়ির সবাই এটা জানে। আসলে শুধু কথা না। ঘুম থেকে উঠে কারো সামনে থাকতেও ভালো লাগে না তার। এই সময়টা নিজের মত থাকতেই ভালো লাগে তার।

নাস্তার পর শাওয়ার নিয়ে দাঁত ব্রাশ করে বেরুল। প্রতিবার শাওয়ারের পরেই দাঁত ব্রাশ করার অভ্যাস তার। না করতে পারলে মনের ভেতর খচখচ করতে থাকে। মনে হতে থাকে কিছু একটা করা হয়নি বাদ পরে গেছে।

অফিসে যাবার জন্য রেডি হচ্ছে অনিন্দিতা। তার রেডি হতে বেশি সময় লাগে না। চুল আঁচড়ে ঠোটে ম্যাকের লিপ গ্লস আর হালকা পারফিউম। মেকআপের অভ্যাস নেই তার। এমনকি চোখে কাজল দেবার প্রয়োজনও বোধ করেনি কখনো। খুব সাধারণ পোশাকেই অফিস যায় সে। কেতাদুরস্ত জামাকাপড়ে দম বন্ধ লাগে তার। সামর্থ্য থাকার পরও তেমন কোন বিলাসিতাই তার নেই। অনিন্দিতার একমাত্র বিলাসিতা হচ্ছে ব্যাগ। তার ঘরে দেয়াল জুড়ে থাকা ক্লসেট ভরে আছে নানান ব্র্যান্ডের ব্যাগে। বারবারিজ, প্রাডা, লুইস ভুটন, রেফ লরেন। ক্লসেটের একেক অংশে একেক ব্র্যান্ডের ব্যাগ। এর অনেক গুলোই কোনদিন ব্যবহৃত হয়নি। হয়তো কোনদিন হবেও না।

ক্লসেটটা অত্যাধুনিক। বন্ধ অবস্থায় পুরোপুরি সিল্ড থাকে। প্রতিটা দরজা খোলার সাথে সাথে ভিতরে আলো জ্বলে উঠবে। এক সারিতে রাখা প্রতিটা ব্যাগে সমান ভাবে আলো পরবে। ক্লসেটের ভেতর জলীয় বাষ্প শুষে নেবার ব্যবস্থা আছে। এই দেশের আবহাওয়াতে চামড়ার জিনিষ বেশি দিন টেকে না। এই ক্লসেটে সেই সমস্যা নেই। এই ক্লসেট তারঘরের দেয়ালের মাপে অর্ডার করে বানানো হয়েছে জার্মানি থেকে।

ক্লসেটের দরজা খুলে ব্যাগগুলোর দিকে চোখ বুলাচ্ছে অনিন্দিতা। সপ্তাহের বেজোড় দিনে জোড় সংখ্যার কম্পার্টমেন্টের ব্যাগ বের করে আর জোড় হলে বেজোড়। মিনিট খানেক চোখ বুলিয়ে একটা বেছে নেয়। তারপর লিপগ্লসটা ব্যাগে ভড়ে বাম হাতের কব্জির উপর হাতলটা ঝুলিয়ে দেয়। তার ব্যাগ খালিই থাকে। অন্য মেয়েদের মত ফেসিয়াল টিস্যু, আয়না, ক্লিপ, চিরুনি বা লিপস্টিক তার ব্যাগে থাকে না।

অফিস আওয়ার দশটায় হলেও সোয়া নয়টা থেকে সাড়ে নয়টায় অফিসে পৌঁছে সে। স্কুলে পড়ার সময়ও প্রথম ক্লাস শুরুর আধ ঘন্টা আগেই স্কুলে পৌছাতো সে। এমন না যে সে সামনের বেঞ্চে বসার জন্যে যেত। ক্লাস শুরুর আগে খানিকটা সময় চুপচাপ বসে থাকার মধ্যে এক ধরনের আনন্দ আছে। খুব বেশি মানুষ ব্যাপারটা বোঝে না। চাকরী করলেও অভ্যাসটা এখনো যায়নি তার। দিনের দ্বিতীয় মগ কফি খেয়ে কাজ শুরু করে। তবে এবার আর ব্ল্যাক কফি না। দুধ চিনি সবই থাকে।

দুপুরে মনে পড়লো রাতে বাসায় দাওয়াত আছে। বাসায় গিয়ে সেজে গুজে রেডি হতে হবে। এমনিতে সে কোন দাওয়াতে যায়না। কারণ কোন অনুষ্ঠানে গেলে সাজগোজ করতে হয়। সাজগোজ তার অসহ্য লাগে। নিজের বাসার দাওয়াত এড়াবার উপায় নেই। আবার না সেজেও সবার সামনে আসা যায় না। উচ্চশ্রেণীর মানুষজনের বেলায় কাউকে দাওয়াত করে তার সামনে সেজে গুজে না গেলে তারা মনে করে, তাদেরকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়া হয়নি।



অনিন্দিতা, উপন্যাস , , No comments