Archive for July 27, 2012

সিরাজুল ইসলাম

অগাস্ট ৮, ১৯৭১। ঘড়িতে সময় সকাল ৮ টা। বড়ছরার সাচনা ঘাটি। সকালের নাস্তা শেষে চা খাচ্ছেন কর্নেল আহমেদ বেগ। সকালে ঘুম থেকে উঠেই আম্মির চিঠি পেয়েছেন। আম্মি তাকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন। গত সপ্তায় তাকে নিয়ে দুঃস্বপ্ন দেখেছেন। আম্মি পীর বংশের মেয়ে। তিনি বিশ্বাস করেন, খারাপ কিছুর আগে স্বপ্নে খবর পান। তাকে নিরাপদে থাকতে বলেছেন। সাচনায় তার নেতৃত্বে ৬০০ চৌকস পাক সেনা আছে। যারা পুরো ঘাটি নিরাপদে রেখেছে। নিরাপদে থাকা তার জন্য সমস্যা না, সমস্যা হচ্ছে আম্মির হাই প্রেসার আছে। অযথা চিন্তায় শরীর খারাপ করবে। আজই চিঠি পাঠাবেন আম্মিকে অযথা চিন্তা না করতে। তাছাড়া তার কাজও শেষ হবে জলদি। এই ভীতুর ডিম বাঙ্গালীদের ডলা দিতে বেশিদিন লাগবে না। ডলা কঠিন হবে। একেবারে পিষে ফেলতে হবে। জীবনে যেন কোনদিন মুখ দিয়ে জয় বাংলা না বের হয়।

চা শেষ করে আহমেদ বেগ উঠে দাঁড়ালেন। হাটা দিলেন ইন্টারোগেশন সেলের দিকে। গত রাতে জন দশেক বাঙ্গালীকে ধরে আনা হয়েছে। সম্ভবত এরা মুক্তিযোদ্ধাদের খবর জানে। দেখা যাক সারা রাতে এদের পেট থেকে কি খবর বের হয়েছে। আজ ভ্যাপসা গরম পড়েছে। তার গোলাপি চেহারা বারবার ঘামে ভিজে যাচ্ছে। রুমালে মুছে কুলাতে পারছেন না। সকালে থেকেই আকাশ থমথমে। বাতাসের লেশ মাত্র নেই। চারিদিকে গুমট একটা ভাব। প্রকৃতি নিজের রূপ অবলীলায় মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেয়। কেন যেন মনে হচ্ছে আজ কিছু একটা হবে। কেমন অজানা আশংকায় মন ছেয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ সংবিৎ ফিরে পেলেন আহমেদ বেগ। এসব কি ভাবছেন তিনি। তার গায়ে পাঠানের রক্ত। ভয় পাওয়া তার সাজে না। মন থেকে সব শঙ্কা দূর করে হাটার গতি বাড়ালেন।

সকাল ১০ টা। জামালগঞ্জের সাচনা ঘাটির পেছনের খালের বাধ ঘেঁষে শুয়ে আছেন কমান্ডার সিরাজুল ইসলাম। সারা শরীর কাঁদা পানিতে মাখামাখি হয়ে আছে। গতরাতে অন্ধকারে রেকি করে এখানে এসেছেন। একা আসেননি, তার ছোট্ট প্লাটুনের সবাই সঙ্গে এসেছে। ছড়িয়ে আছে ঘাটির চারদিকে। আলো ফোটার পর কেউ নরেনি। এখন সময় হয়েছে। সব কয়টা দেহ এক সাথে নড়ে উঠবে। হাতের অস্ত্রগুলো বাঘের মত গর্জে উঠবে। সামর্থ্যের শেষ বিন্দু দিয়ে লড়বে। আর কোন পথ খোলা নেই সামনে। কারো বেচে ফেরার সম্ভাবনা কম। অবশ্য এই নিয়ে কেউ ভাবছে না। এতো ভেবে যুদ্ধ করা যায় না। দেশ স্বাধীন করা যায় না। মরুক বাঁচুক লক্ষ্য একটাই এই ঘাটির দখল নেয়া।

ঘাটির সুরক্ষা ভাল। নিজেদের দুর্বল জায়গাগুলোতে খেয়াল রেখেছে ভালো মতই। এরা সাঁতার জানে না। খালের দিকের আক্রমণে পিছিয়ে পরবে, তাই বাঙ্কার গুলো খালের দিকে। সেনা ছাউনি আর অস্ত্রাগার উল্টো দিকে। শেষ বারের মত পরিকল্পনাটা আরেকবার নিজের মনে আউরে নিলেন। খালের দিক থেকে আক্রমণ করা ছাড়া উপায় নেই। অন্যদিক থেকে আসলে পাখির মত গুলি খেয়ে মরা ছাড়া আর কিছুই হবে না।

আক্রমণ শুরু হল। যত সময় যাচ্ছে মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থা খারাপের দিকে যাচ্ছে। তাদের ১ টা গুলির বিপরীতে ঘাটি থেকে পাল্টা গুলি আসছে ২০ টা। এভাবে বেশিক্ষণ টিকে থাকে যাবে না। সবাইকে নিয়েই মারা পরবে। একটাই উপায় আছে এখন। কোনভাবে বাঙ্কারগুলো উড়িয়ে দেয়া। এতো দূর থেকে পারা যাবে না। ক্রল করে সামনে যেতে হবে। প্রথমে সিরাজ নিজেই যাবেন। সে মারা পরলে যাবে আলি রাজা। গ্রেনেড নিয়ে ধীরে ধীরে আগাতে লাগলেন বাঙ্কারের দিকে। তার থেকে নজর অন্যদিকে ফিরাতে অন্যদিক থেকে প্রাণপণে গুলি ছুড়ে যাচ্ছে বাকিরা। মিনিট পাঁচেক অমানুষিক পরিশ্রমের পর নাগালে পৌঁছে গেলেন বাঙ্কারের। শান্ত হাতে গ্রেনেড চার্জ করলেন নিখুঁত নিশানায়। নিমেষে ছিন্নভিন্ন হয়ে উড়ে গেল অনেকগুলো দেহ।

আকস্মিক আক্রমণে ঘাটির সেনারা ধরতে পারলনা আক্রমণের দিক। অন্য বাঙ্কার থেকে আরও প্রবল ভাবে গুলি আর গ্রেনেড ছোড়া শুরু হল খালের দিকে। এমন চমৎকার সুযোগ কাজে লাগাতে ভুল করলেন না সিরাজ। খানিকটা এগিয়ে পরের বাঙ্কারেও চার্জ করলেন আরেকটা গ্রেনেড। মুহূর্তে পাল্টে গেল যুদ্ধের আবহ। পাক বাহিনী রণে ভঙ্গ দিল। ঘাটি ছেড়ে পালাতে শুরু করল পেছনে বৃষ্টির মত গুলি ছুড়তে ছুড়তে। মুক্তিবাহিনীর প্লাটুনের সবাই আস্তে আস্তে এগিয়ে ঘাটির দখল নিতে লাগলো। এক সময় বন্ধ হয়ে এলো পাক বাহিনীর গুলি ছোড়া। সবাই প্রাণপণে ছুটছে। ছুটে পালাচ্ছে এই সাধারণ অস্ত্রে সজ্জিত বাঙ্গালী যোদ্ধাদের হাত থেকে।

এমন অভাবিত সাফল্যে নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না সিরাজ। স্লোগান দিয়ে সবার আগে দাঁড়িয়ে দুচোখ জুরিয়ে দেখতে লাগলেন শত্রুমুক্ত ভূমি। হাতের অস্ত্র উঁচিয়ে তারস্বরে চিৎকার দিলেন, জয় বাংলা। পজিশনে থাকা বাকিরাও এক সাথে গর্জে উঠল, জয় বাংলা। এই গর্জনের সাথে আরেকটা গর্জনও হল তবে সেটা পলায়মান শত্রুর ‘কাভারিং ফায়ারের’। গুলিটা বেধে সিরাজের চোখে। চিকিৎসার জন্য মিত্র বাহিনীর হেলিকপ্টারে ভারতে নেওয়ার পথেই শেষ বারের মত চোখ বুজলেন সিরাজ। সবাই বুঝলেন, একটু বেশীই তাড়াহুড়ো করে ফেলেছিলেন সিরাজ। তবে কোন অতৃপ্তি নিয়ে ঘুমাননি সিরাজ। চোখ বুজার আগে স্বাধীন মাটিটা তিনি দেখেছেন। এই সৌভাগ্য খুব বেশী মানুষের হয়না।

সেদিন সন্ধ্যায় খাসিয়া পাহাড়ের ঢালে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের ‘নো ম্যান্স ল্যান্ড’-এর কাছাকাছি টেকেরঘাটে সিরাজুল ইসলামকে সমাহিত করা হয়। পূর্ণ সামরিক মর্যাদায়। বাংলার মাটি এই বীর সন্তানকে নিজের বুকে ধারণ করতে পারেনি। শুধু সিরাজুল ইসলামই না, তার মত আরও অনেকেই যুদ্ধ শেষে মায়ের বুকে ফেরেনি। বাংলার মাটি এই বীর সন্তানদের মমতার আচলে জরায়নি। গভীর ভালবাসায় বুকের ভেতর রেখে বলেনি, খোকা ঘুমাও। এই দুঃখ সীমাহীন। আজও আকাশের তারারা জ্বলজ্বলে চোখে এদের খুঁজে বেরায়, গভীর বেদনায় বাতাস হুহু শব্দে কাঁদে, মাটিতে কান পেতে শোনা যায় অব্যক্ত হাহাকার, খোকা নাই! ফেরে নাই!

দৃষ্টব্য: এই গল্প একাত্তরের চিঠি অবলম্বনে লিখা। বীরপ্রতীক সিরাজুল ইসলামের কাহিনী নিয়ে। নাম, কাল, পাত্র কিছুই বদলাইনি। শুধু আমার কল্পনায় ঘটনার ছবি এঁকেছি।

উৎস:
একাত্তরের চিঠি
http://www.prothom-alo.com/detail/date/2011-12-14/news/208556



গল্প No comments

আষাঢ়ে গল্পঃ শেষ পর্ব

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আতাউল গনির সামনে বসে আছেন। যদিও এই নামে লোকটাকে তেমন কেউ চেনে না। সবার কাছে সে পিচ্চি গনি। লম্বায় প্রায় ৬ ফুট একটা মানুষকে কেন পিচ্চি বলা হয় মোজাম্মেল রফিক জানেন না। অবশ্য জানতে ইচ্ছেও করছে না। খুব সাদামাটা চেহারা। গায়ের রং শ্যামলা। মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। একটু খেয়াল করলে বোঝা যায়, চোখ দুটি জ্বলজ্বলে। খুব কম মানুষই চোখ দিয়ে কথা বলতে পারে। এই লোকটা তাদের মধ্যে একজন। অথচ লোকটাই দেশের সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসীদের একজন। নানান রকমের মানুষের সাথে সময় কাটান মোজাম্মেল রফিকের একটা শখ। তার অনেক দিনের ইচ্ছা, বড় কোন সন্ত্রাসীর সাথে কথা বলবেন। পিচ্চি গনি আজ সকালে র‌্যাবের হাতে ধরা পড়েছে। অবশ্য এই খবর এখনো বাইরের দুনিয়া জানে না। সবার নিষেধ সত্ত্বেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এই ভয়ংকর মানুষটার সাথে একা কথা বলতে এসেছেন। যদিও লোকটা নিরস্ত্র তারপরও নিরাপত্তা বাহিনীর লোকজন অস্বস্তিতে আছে। জানালা বিহীন একটা ঘরে তারা বসে আছেন। দুই চেয়ারের মাঝে ছোট একটা টেবিল। তাদের কথাবার্তার কিছুই রেকর্ড হবে না। পৃথিবীর প্রতিটা মানুষের আলাদা সাইকোলজি আছে। যে মানুষটা ২ ডজনের বেশী লোককে ঠাণ্ডা মাথায় খুন করেছে তার সাইকোলজি সাধারণ হবার কথা না। আতাউল গনিকে দেখে বোঝা যাচ্ছে সে একটুও ভয় পাচ্ছে না। শান্ত ভাবে মুখোমুখি বসে আছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কথা শুরু করলেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীঃ আমাকে চেনেন?
গনিঃ জি স্যার।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীঃ আমি কেন এখানে এসেছি জানেন?
আতাউল গনি হাসল। লোকটার হাসি সুন্দর। হাসিতে কোন ধূর্ততা নেই। অভিনয়ও নেই।
গনিঃ আপনে এমনেই আসছেন। কোন কারণে আসেন নাই।
লোকটা বুদ্ধিমান। যে লোক দেশে না থেকেও এতো বড় নেটওয়ার্ক চালায় তার অবশ্যই বুদ্ধি থাকবে। ভালই থাকবে। এটাই স্বাভাবিক।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীঃ ঠিকই ধরেছেন। আমি কোন কারণে আসিনি। আপনাকে জিজ্ঞাসাবাদ করতেও না। আপনার আপত্তি না থাকলে ঘণ্টা খানেক গল্প করব। এই এক ঘণ্টা আপনি সত্যি কথা বলবেন। কোন প্রশ্নের উত্তর না দিতে চাইলে দেবেন না। তবে আমি কারো নাম পরিচয় কিমবা আপনার নেটওয়ার্ক নিয়ে প্রশ্ন করব না।
আতাউল গনি আবারো হাসল। ঠিক আছে স্যার।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীঃ চা খাবেন?
গনিঃ আমার চা, পান, সিগারেটের অভ্যাস নাই। আপনে খাইলে সাথে খাইতে পারি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ঘড়ি দেখলেন। রাত সাড়ে ৯ টা।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীঃ আমার সাথে রাতের খাবার খেতে আপত্তি আছে?
গনিঃ না।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীঃ আপনার পরিবারের কেউ আছে?
গনিঃ না।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীঃ কাউকে খুন করার সময়, আপনার কখনো খারাপ লাগেনি?
গনিঃ না। তয় খুন করার পরে মাঝে মাঝে চমক লাগে। মনে আহে, এহন আমার লগে আজরাইলও আছে। আজকে এরে নিতাসে একদিন আমারে নিবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীঃ তখন ভয় লাগে না?
গনিঃ না।

গনি লোকটার সাথে কথা বলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভালো লাগছে। ভুল পথে না গেলে নিশ্চিত ভাবেই বড় ভালো কিছু হতে পারতেন। গল্প করতে করতেই খাবার আসলো। এক টেবিলে বসে দুজন খাচ্ছে। দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একজন সন্ত্রাসীর সাথে এক টেবিলে খাচ্ছে। ব্যাপারটা কারো পছন্দ হচ্ছে না। এই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাজকর্ম আজব। ওনাকে দিয়েই এটা সম্ভব। আতাউল গনি খুব বোকার মত ধরা পড়েছে। ফরিদপুরে সে একটা এতিমখানা চালায়। যদিও এই এতিমখানা তার না। সে নিজেও এখানে এতিম হিসাবে কখনো থাকেনি। তারপরও কোন এক কারণে এর সব খরচ নিজে বহন করে। কেন করে কেউ জানে না। এই লোক সাধুসন্ন্যাসী না। জনসেবাও তার কাজ না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তার রেকর্ড পড়েছেন। আতাউল গনির কেউ এই এতিমখানায় নেই। তারপরও প্রতিবছর একবার এই সে এতিমখানায় ঘুরে যায়। তার ভালই জানার কথা পুলিশ এখানে নজর রাখে। তারপরও সে এসেছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীঃ আপনি কি জানতেন না যে এই এতিমখানার উপর নজর রাখা হয়?
গনিঃ জানতাম। গত তিন বছর ধইরাই পুলিশ নজর রাখে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীঃ আপনি বুদ্ধিমান মানুষ, তারপরও বোকার মত এলেন কেন?
আতাউল গনি হাসলেন। বোঝা গেল জবাব দেবেন না।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীঃ এই এতিমখানাটা আসলে কার?
গনিঃ আপনি জাইনা কি করবেন?

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এই এতিমখানার ব্যাপারে খোঁজ নিয়েছেন। রেকর্ড বইয়ে সব বাচ্চার নামের পাশে, কুড়িয়ে পাওয়া লিখা। এতিমখানার রেজিস্ট্রেশনও নেই। কে শুরু করেছে জানা যায়নি। পরে এলাকায় খোজ নিয়ে জানলেন, ১০ বছর আগে এক মহিলা টাকা পয়সা দিয়ে জমি কিনে ঘর বানিয়ে এতিমখানা শুরু করে। যেই শিশুগুলো থাকছে তাদেরও তিনিই নিয়ে আসেন। পরে পুরো সম্পত্তি ওয়াকফে হিসাবে রেকর্ড করানো হয়। মহিলা লোকজন রেখে চলে যান। মাসে একবার ওই মহিলা আসতেন। যারা কাজ করে সবাইকে মাস শেষে বেতন দিতেন। একসময় ওই মহিলা আসা বন্ধ করে দেয়। কিছুদিন পর থেকে আতাউল গনি এর দায়িত্ব নেয়। পুলিশ রেজিস্ট্রেশন অফিস থেকে মহিলার ঠিকানা দেখে খোঁজ নিয়েছেন। ওই নামে ওই ঠিকানায় কেউ থাকে না। এই এতিমখানার ব্যাপারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আগ্রহ রয়েছে। এই লোক শুধুশুধু এতিমখানা চালায় না। কোন কারন অবশ্যই আছে। মনে হচ্ছে না আতাউল গনি কিছু বলবে। খাওয়া শেষ করে মোজাম্মেল রফিক উঠলেন। বেরোনোর সময় আতাউল গনি ডাকলেন।

গনিঃ আপনে এতিমখানার ব্যাপারটা জানতে চান। আপনারে এক শর্তে বলতে পারি। আর কাউরে কোনদিন এই ব্যাপারটা বলবেন না।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীঃ আপনাকে কথা দিচ্ছি কেউ জানবে না।
গনিঃ বছর পাঁচেক আগে হাতে একটা কাম আইল। রাহেলা নামের এক মহিলারে মারতে হবে। ভালো মহিলা না। সুনামগঞ্জের তালতলার চেয়ারম্যানের কাম। চেয়ারম্যানের ভাড়া করা লোক বাজার ঘরের মালিকরে মাইরা ফেলসে। খুনের চাক্ষুষ সাক্ষী রাহেলা। যদিও কোন দরকার ছিল না, তাও চেয়ারম্যান সাব কোন সাক্ষী রাখবেনা। এক জায়গায় একজন ২ বার কাম করে না। তাই আমার ডাক পরছে। গ্রামে-গঞ্জে কাম সারার ভালো টাইম সন্ধ্যার একটু পর। অন্ধকারে যেমন কাম সারা যায়। তেমন রাস্তাঘাটে মানুষজনের সাথে গা ঢাকাও দেয়া যায়। গুলি ছুঁইরা শব্দ করার মানে হয়না। ছুড়ি দিয়াই কাজ সারি। ছুড়ি চালানোর পর সবাই চিক্কুর দেয়। তাই আগেই হাত দিয়া মুখ চাইপা ধরি। মানুষজন ঝাপটায়। রাহেলা কিছুই করলনা। হঠাৎ মনে হইল আমারে কিছু কইতে চায়। কি জানি মনে কইরা মুখ ছাড়লাম। বেচারি বড় দম নিল কয়েকটা। শেষ দমটা নেয়ার আগে আস্তে আস্তে কইল, “ভাইজান আমারে মারার জন্য আপনার উপর আমার রাগ নাই। ফরিদপুরের কমলতলিতে আমার বাচ্চা-গুলারে দেখবেন।” মরার সময় মানুষ উলটা পাল্টা কয়। আমি ভাবলাম এই মহিলাও তাই। সে থাকে এই বাজার পারায়। তার বাচ্চা এতো দূরে কেন থাকবে। কাম শেষে লোকেশনে থাকতে হয়না। আমি চইলা আসি। ধান্দার মইদ্দে ভুইলাও যাই।

মাস খানেক পর আবার মনে হইল রাহেলার কথা। কি মনে কইরা খোঁজ লাগাইলাম। তারপরে এক তাজ্জব কাহিনী জানলাম। বাজারের সব মেয়ে লোক মিলা এই এতিমখানা দিসে। নিজেগো বাচ্চারা নিজের পরিচয় জানুক চায়নাই। এতিমখানায় রাইখা ওগোরে মানুষ করতাছিল। ওরা বড় হইতাসে এতিম হিসাবে। একমাত্র রাহেলা ছাড়া আর কেউ জানে না, এতিমখানা কই। নিজের পেটের সন্তান। একদিন না একদিন দেখতে মন কানব। আর দেখতে গেলেই পরিচয় বাইর হইব, তাই নিজেরাই ঠিক কইরা নিসে যে রাহেলা ছাড়া আর কেউ জানবো না, বাচ্চা কই আছে। আরও তাজ্জব হইল এগো মধ্যে রাহেলার নিজের বাচ্চা নাই। রাহেলা মরার পর আর কেউ জানেনা বাচ্চাগুলান কই আছে, কেমন আছে। নিজে গেলাম কমলতলি। সত্যি সত্যিই একটা এতিমখানা আছে। বাচ্চাগুলার বাপ মায়ের কোন হদিস নাই। এতিমখানা চলার টাকা রাহেলা দিয়া যাইত। এখন রাহেলা নাই। আমার কাম ছিল রাহেলারে মারা। এই বাচ্ছাগুলারে না। নিজেও জানি না। কেন জানি এগো ভার নিজেই নিলাম। বছরে একবার গিয়া দেইখা আসতাম। কেন যাইতাম নিজেও জানি না।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্তব্ধ হয়ে রইলেন। অন্ধকার জগতের এক মানুষের মনে এতোটা আলো থাকতে পারে তিনি কখনো কল্পনাও করেননি। মানুষ রক্তের টানে অনেক কিছু না করলেও মনের টানে করে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী উঠলেন বেড়িয়ে আসার সময় আবার ঘুরে জিজ্ঞেস করলেন। এতিমখানার কথাটা হঠাৎ আমাকে কেন বললেন।
গনিঃ আজকের রাত আমার জীবনের শেষ রাত।
আতাউল গনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দিকে হেটে এলেন। চোখের দিকে তাকিয়ে থাকলেন কিছুক্ষণ। তারপর বললেন,
এই বাচ্চা-গুলারে রাহেলাও দেখতনা। আমিও দেখতাম না। উপরওয়ালা দেখত। আমরা ছিলাম উসিলা মাত্র। এখন থেকে নতুন উছিলা হবে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বেড়িয়ে এলেন। গাড়িতে উঠার আগে কমান্ডারকে জিজ্ঞেস করলেন। আজ রাতে আতাউল গনিকে নিয়ে আপনাদের বিশেষ পরিকল্পনা আছে? কমান্ডার মাথা নাড়লেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কিছু বললেন না। আতাউল গনিকে বাঁচানোর চেষ্টাও করলেন না। অন্য কারো কাজে নাক গলান তার স্বভাব না। আতাউল গনি তার কাজ শেষ করেছে। বাচ্চাগুলোর দায়িত্ব সে হস্তান্তর করে ফেলেছে। পরের এক সপ্তা দেন দরবার করে এই এতিমখানায় সরকারী বরাদ্দর ব্যবস্থা করলেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এখন নজর দিয়েছেন পুলিশের অবকাঠামোতে। অল্প কিছু বাদে বাকি থানাগুলোর অবস্থা ভয়াবহ। দুর্গন্ধে থানায় দাঁড়িয়ে থাকা দায়। অল্প জায়গায় গাদাগাদি করে চলে কাজকর্ম। যারা মানুষের শান্তিতে থাকা নিশ্চিত করবে, তাদের থাকার জায়গাই যদি এমন হয় তো কি করে চলবে। জেল হাজতের অবস্থা না বললেও চলে। গরিব দেশ একবারে সব সম্ভব না। পাঁচ বছর মেয়াদে আস্তে আস্তে সব বদলাবে। কোন থানার নতুন ভবন উদ্বোধন করতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজে কখনো যাননি। এমনকি পুলিশের উপরের দিকের কেউও যায়নি। কাজ শেষ হবার পরদিন সকালে যে সর্বপ্রথম থানায় আসে, সেই লোকটাই ফিতা কেটে থানার উদ্বোধন করে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশ এমনই। জনগণের টাকায় করা ভবনের উদ্বোধন জনগণেরই করা উচিৎ। কিশোর সংশোধন কেন্দ্রগুলো মোটামুটি অভিশাপের মত। কোন কিশোরের সংশোধন তো পরের কথা। যারাই যায়, ভবিষ্যতে নামি অপরাধী হবার তালিম নিয়ে বেড়য়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেও বুঝছেন না কি করা উচিৎ। তারও সীমাবদ্ধতা আছে। এরকম ২/১ টা ব্যাপার ছাড়া আর সবকিছুই গুছিয়ে আনছেন।

যেকোনো কিছু ২ ভাবে কাটে। হয় ধারে কাটে নয়তো ভারে কাটে। ধার বলতে প্রতিভা আর ভার বলতে অভিজ্ঞতা। খুব কম কম লোকই ধারে আর ভারে সমান ভাবে কাটে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ধারে এতদিন ধারে কেটেছেন। অভিজ্ঞতা নামক ভারটা তার নেই। রাজনীতির ছোট খাটো মারপ্যাঁচ বুঝলেও বড় গুলো তার বোঝার কথাও না। ক্ষমতার দশম মাসে এসে তিনি রাজনীতির সবচেয়ে কুৎসিত রূপটা টের পেলেন। তিনি নিজেও জানতেন স্রোতের বিরুদ্ধে চলার জন্য একদিন বড় একটা বিপদে পরবেন। সৈয়দ মুজতবা আলি নামের লোকটা এমনি এমনি বলেননি, অনিয়মের দেশে নিয়মটাই অনিয়ম। তিনি এতদিন এই নিয়ম নামের অনিয়মে চলেছেন।

ঘটনার শুরুটা সামান্য। পানির দাবিতে গাজীপুরের এক গ্রামের লোকজন রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছে। এই দেশে এই সব ঘটনা অহরহই ঘটে। পুলিশ গিয়ে রাস্তা ক্লিয়ার করার চেষ্টা করল। বাধ সাধল এলাকার সংসদের ভাই। এই সাংসদ বর্তমানে জেলে আছে। সদস্যপদ শূন্য হয়েছে। সামনে উপনির্বাচন হবে। খুব সম্ভবত তার ভাই নতুন সাংসদ হবার চেষ্টায় আছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ লোকটাকে এরেস্ট করে গাড়িতে উঠায়। ঘটনাটা সব লোকজন আর সাংবাদিকের সামনেই হয়। মানুষজনকে বুঝিয়ে রাস্তাও ছেড়ে দেওয়া হয়। গাড়ি কিছুদূর যাবার পর হঠাৎ পুলিশ টের পায় সাংসদের ভাই মারা গেছে। পুরো ব্যাপারটা হয়েছে পুলিশ হেফাজতে থাকার সময়। নেতিবাচক খবর সবসময় ভালো খবরের আগে চলে। মুহূর্তে চাউর হয়ে যায় সবখানে। ঠিক এমন একটা সুযোগের অপেক্ষাতেই ছিল বাকিরা। রাজনীতির খেলায় এরা কম যায়না। ঘটনা। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সম্পর্কে নেতিবাচক খবর ছড়িয়ে পরতে লাগলো সবখানে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনীতির খেলায় চমকে গেলেন। সাংসদ নিজেই তার ভাইকে খুন করিয়েছে। তবে বেশ পাকা হাতে। প্রমাণসহ আসল ঘটনা বের করতে সময় লাগবে। এই সময় টুকুতেই যা হবার হয়ে গেল। টিভি আর সংবাদে তার বিরুদ্ধে প্রতিবেদন আসতে লাগলো। নেতারা তার বিরুদ্ধে বিবৃতি দিতে লাগলো। রাতারাতি নিজের অবস্থান পালটাতে দেখলেন মোজাম্মেল রফিক। তবে কাপুরুষের মত পালিয়ে থাকলেন না। সংবাদ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসাবে নিজের দায় স্বীকার করলেন। পুরো ঘটনার জন্য ক্ষমাও প্রার্থনা করলেন, দল আর সাংসদের পরিবারের কাছে। দলীয় নেতারা দাবি করলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তার পদে থাকলে ঘটনার তদন্ত বাধাগ্রস্ত হবে। তাকে অবশ্যই বরখাস্ত করতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে বৈঠক বসল দলীয় সর্বচ্চ নীতিনির্ধারকদের। সিদ্ধান্ত নেয়া হল, বরখাস্ত করা হবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে। সকালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ডেকে পাঠান হল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে।

ফজরের নামাজের পর বাসভবনের পেছনের উঠানে বসে আছেন প্রধানমন্ত্রী। এখনো সূর্য উঠেনি। অনেক দিন পর বাগানের খোলা হাওয়ায় বসেছেন। থেমে থেমে চলতে থাকা ঠাণ্ডা হাওয়ায় ভালই লাগছে। একা থাকতে পারলে আরও ভালো লাগত। নিরাপত্তার খাতিরে অন্তত এক ডজন লোক পুরো বাগান ঘিরে আছে। দেশের প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে ঘরের বাইরে একা থাকা সম্ভব না। আজ খুব ভোরে ঘুম ভেঙ্গে গেছে। গতরাতে পুরনো দুঃস্বপ্নটা আবার দেখেছেন। অনেক দিন পর নিজের বড় ভাইকে স্বপ্নে দেখলেন। মৃত মানুষের বয়স বাড়ে না। ভাইটা আগের মতই আছে। কাঁধ পর্যন্ত ছড়ানো কোকরা চুল। রোদে পোড়া তামাটে চেহারা। বুদ্ধিদীপ্ত চোখ আর ভরসা দেয়া চাহনি। বসার ঘর থেকে ভরাট গলায় ডাকছে। নাজু এদিকে আয়। তার নাম নাজু না। নাজনিন নাহার। শুধু দাদাই তাকে এই নামে ডাকতো।
জি দাদা।
আমাদের জন্য চা নিয়ে আয়। ১০ মিনিটে আসবি।
নাজনিন চা নিয়ে এসেছে। ১০ মিনিটের মধ্যেই এসেছে। তবে সেই চা কেউ খায়নি। বসার ঘরে সবাই নিথর হয়ে আছে। রক্ত মাখা শরীর গুলো নড়ছে না। সবার মাঝে গুলিতে ঝাঁঝরা হওয়া দাদার শরীর। সারা মেঝেতে রক্ত, দেয়ালে রক্ত। হাতের ট্রেতে চায়ের কাপেও চা নেই, রক্ত। তীব্র আতংকে চিৎকার দিতে গিয়ে খেয়াল করলেন, গলা দিয়ে শব্দ বের হচ্ছে না।
প্রধানমন্ত্রীর ঘুম ভেঙ্গে গেছে। দাদা মারা যাবার পর পর এই স্বপ্নটা তিনি অনেক বার দেখেছেন। তবে আজ দেখেছেন অনেক দিন পর।

কাজ পাগল লোকটা মানুষকে মন্ত্রমুগ্ধ করেছে অনায়াসে। নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোই ছিল তার প্রধান কাজ। কি ভাবে মানুষের জন্য ভালো কিছু করা যায় এই নিয়েই থাকত সারাদিন। মন থেকে মানুষের ভালবাসা পেতে কখনো কষ্ট করতে হয়নি। একবার বন্যার সময় কোথায় যেন যাবার সময় দেখেছেন, খেতের পাশে শখানেক লোকের আহাজারি। গাড়ি থেকে নেমে জানতে চাইলেন কি হয়েছে। ধান পেকেছে। সব জমির ধান কাটতে, কম করে হলেও সময় লাগবে পুরু এক সপ্তা। বন্যার যে অবস্থা, তাতে বড় জোর ২/৩ দিনেই কয়েকশত কানি জমির সব ধান তলিয়ে যাবে। এই ধানের উপর নির্ভর করে এই অঞ্চলের সব লোকের সারা বছরের খোরাক। ওই মুহূর্তে সবাইকে নিয়ে লেগে পরলেন ধান কাটতে। খবর পাঠিয়ে আশেপাশের অঞ্চলের লোকজনও জড় করে নিয়ে আসলেন। দিন রাত খেটে মাত্র দুই দিনেই সাড়ে তিনশো কানি জমির ধান কাটা হয়ে গেল। ক্লান্ত তৃপ্ত কৃষকদের ফেরার পথে বলে এলেন। বুঝলা মিয়ারা, খাটে খাটায় দ্বিগুণ পায়।

দাদার সব কিছুতেই সময় ধরা থাকত। সময় সময় করতে করতেই মানুষটা অসময়ে চলে গেছে। একা যায়নি তাকে ছাড়া পরিবারের আর সবাইকেও নিয়ে গেছে। নির্বাচনের মাত্র ৬ মাস আগে। মানুষের জন্য কাজ করতে প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারে বসেননি। গুলিতে ছিন্ন দেহ নিয়ে কবরে শুয়েছেন। তারপরের গল্পটা অন্যরকম। ভাইয়ের বদলে ৬ মাস পরে তিনি প্রথম বারের মত প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। যদিও রাজনীতি নিয়ে কোনদিন চিন্তাও করেননি। অথচ কি জলদি বদলে গেছে তার জীবন। আজ বহু বছর পর পুরনো সৃতিগুলো ফিরে আসছে। দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসছে। হঠাৎ বুঝতে পারলেন কেন এই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে তিনি এতোটা পছন্দ করেন। এই লোকটা মনের অজান্তেই দাদাকে মনে করিয়ে দেয়।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অপেক্ষা করছেন। আসার আগে নিজের অফিসে সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে এসেছেন। বেশীর ভাগ লোক মুষড়ে পরেছে। কয়েকজন কান্নাকাটিও করেছে। বেশ কয়েকজন ঘটনার দায়ভার নিজের কাধে নিতে চেয়েছেন, মন্ত্রী রাজি হননি। প্রধানমন্ত্রী ১০ টায় তার সাথে দেখা করবেন। আসলে ঠিক দেখা করবেন না। তাকে বরখাস্ত করবেন। ঘটনাটা পদত্যাগ হিসাবে দেখান হবে নাকি বরখাস্ত তিনি জানেন না। অবশ্য এতে কিছু যায় আসেও না। তিনি প্রস্তুতি নিয়েই এসেছেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর সামনে বসে আছেন। প্রধানমন্ত্রীর সামনে তার ফাইল।
প্রধানমন্ত্রীঃ আপনার কিছু বলার আছে?
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীঃ না।
প্রধানমন্ত্রীঃ আমার মন্ত্রী সভার বেশীর ভাগ সদস্য চান আপনাকে যেন বরখাস্ত করা হয়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীঃ আমি জানি।
প্রধানমন্ত্রীঃ আপনি কি চান আমি আপনাকে পদত্যাগ করার সুযোগ দেই?
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীঃ না।
প্রধানমন্ত্রী হাসলেন। কিছুক্ষণ থেমে বললেন, আপনাকে কিছুই করা হচ্ছে না। আপনি আপনার দায়িত্ব শেষ করুন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কিছুই বুঝলেন না। এটা তিনি আশা করেননি। এরচেয়ে বেশী অবাক তিনি এর আগে কখনো হয়েছিলেন কিনা মনে করতে পারলেন না।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীঃ আমাকে বরখাস্ত না করার কারণটা জানতে পারি?
প্রধানমন্ত্রীঃ না।

পৃথিবীর সবার সব কিছু জানার দরকার নেই। কারণটা প্রধানমন্ত্রী নিজের ভেতরেই রাখলেন। কোনদিন দলের অন্যরাও কারণটা জানেনি। তার ২ মাস পর ঠিক এক বছরের মাথায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পদত্যাগ করলেন। তিনি তার কাজ শেষ করেছেন। পুরো সিস্টেমটা সাজিয়ে ফেলেছেন। নতুন কেউ চাইলেও একবারে পুরোটা বিগড়াতে পারবেনা। হয় আইন বদলাতে হবে অথবা নতুন আইন পাশ করাতে হবে। জনপ্রিয়তা হারাবার ভয়ে কেউ একেবারে এতো দূর যাবে বলে মনে হয়না। পদত্যাগের পর মোজাম্মেল রফিক নিজের পুরনো পেশায় ফিরে গেলেন। তবে এক বছরের জন্য দেশের বাইরে চলে গেলেন। তিনি চাননি নতুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজের কাজে কোন রকম চাপে থাকুক। মানুষ বেশিদিন কারো কথা মনে রাখে না। এক বছরের মধ্যেই সবাই ওনাকে ভুলে যাবেন। তার পরেই তিনি দেশে ফিরবেন। ঠিক চার বছর পর বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মত কোন দল গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে পরপর দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এলো। এক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের পরিবর্তনের কারণেই মানুষ সরকারী দলের প্রতি আবারো আস্থা রাখল।

আষাঢ়ে গল্পঃ তৃতীয় পর্ব

আষাঢ়ে গল্পঃ দ্বিতীয় পর্ব

আষাঢ়ে গল্পঃ প্রথম পর্ব

দৃষ্টব্যঃ এই গল্প ভবিষ্যতের। আমাদের স্বপ্নের কোন এক ভবিষ্যতের। যে ভবিষ্যতের স্বপ্ন আমরা বুকে লালন করি না। সেই ভবিষ্যত কখনই আমাদের সামনে বাস্তব হয়ে আসবে না। হোকনা স্বপ্নটা আষাঢ়ে গল্প।



আষাঢ়ে গল্প, গল্প No comments

আষাঢ়ে গল্পঃ তৃতীয় পর্ব

আষাঢ়ে গল্পঃ প্রথম পর্ব

আষাঢ়ে গল্পঃ দ্বিতীয় পর্ব

না চাইলেও রাজনীতিবিদদের অনেক ঝামেলার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। যেকোনো এমপিকে তার নিজের এলাকার নেতাকর্মী আর মানুষজনকে সময় দিতে হয়। সমাধান করুন আর না করুন সবার কথা শুনতে হয়। এই লোকগুলোই নির্বাচনের সময় তার হয়ে কাজ করে। নিজের এলাকায় অন্য নেতা উঠতে থাকলে এদের দিয়েই সায়েস্তা করা হয়। নেতাদের কাছে এদের মূল্য অপরিসীম। এদের অন্যায় আবদার হাসিমুখে মেনে নিতে হয়। আর একজন মন্ত্রীর ক্ষেত্রে ব্যাপারটা আরও অনেক বেশী ঝামেলার। যেকোনো সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষেত্রে দেশের ভালোর আগে দলের আর নিজের লোকেদের ভালটা দেখতে হয়। খুব বড়সড় উদাহরণে যাবার দরকার নেই। ছোট খাটো ব্যাপারেই তা বুঝা যায়। শহরের রাস্তাঘাট খুব ভালো ভাবে বানানো আর লেনগুলোর আকার দ্বিগুণ করার চেয়ে, অন্তত শতগুণ বেশী টাকা ব্যায়ে নেতা আর আমলাদের ফ্লাই ওভার করার আগ্রহ বেশী। যদিও প্রথম সমাধানটা বিশ্বব্যাপী কার্যকর যেই সাথে সমাদৃত। এর একটা চমৎকার দৃষ্টান্ত এই দেশেই আছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে মিরপুর রোড পর্যন্ত বাই পাসটা যানজট নিরসনে এই শহরের অন্য যেকোনো ফ্লাই ওভার থেকে শতগুণ বেশী কার্যকর হয়েছিল। অথচ এর প্রকল্প ব্যায় হাজার হাজার কোটি টাকার ফ্লাই ওভার প্রকল্পগুলোর তুলনায় কিছুই না। তারপরও এই সব প্রকল্পে সরকারী দলের অগাধ উৎসাহ। কারণ একটাই, প্রকল্প যত বড়, কমিশন আর লাভের হার তত বেশী। দেশের আর মানুষের জন্য রাজনীতির দিন এখন আর নেই। বেশীর ভাগ নেতাই এখন বড় ব্যবসায়ী। এই সব প্রকল্পের কাজগুল তাদের নিজেদের প্রতিষ্ঠানই পায়। দল ক্ষমতায় আসে ৫ বছরের জন্য। তার পরের ৫ বছর দেশ চালায় অন্য দল। একবার ক্ষমতায় আসার পর এই সব নেতাদের এক সাথে ১০ বছরের ব্যবসা করে নিতে হয়।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোজাম্মেল রফিক নিজের সুবিধাগুলো বোঝেন। তাকে নেতা কর্মীদের সময় দিতে হয়না। দলের লাভক্ষতি নিয়ে চিন্তা করতে হয়না। দল আর নিজের তহবিল নিয়ে ভাবতে হয়না। এই পুরো সময়টা তিনি দিতে পারেন নিজের কাজে। তার নিজের কাজটা বেশ মজার। তিনি পুরো মন্ত্রণালয়কে নতুন করে সাজিয়ে ফেলছেন। এমন না যে একবারে পুরোটা পাল্টে ফেলেছেন। একটু একটু করেই করছেন। কোন ব্যবস্থাই একবারে সরিয়ে ফেলা ঠিক না। হাজার খারাপ হলেও না। একটা সাজানো গোছান বুক সেলফের তাক গুলা ধুম করে সরিয়ে নিলে সব গুলো বই যেমন এলো মেলো হয়ে মাটিতে আচরে পরবে। এক বারে কোন সিস্টেম বদলে ফেললেও তাই ঘটবে। তিনি প্রথমে পুলিশের ঘুষ খাওয়া বন্ধ করেছেন। তাদের বেতন বাড়িয়ে দিয়েছেন। এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটা করছেন। পুলিশের পদোন্নতি আর বদলির একটা নিয়ম দাড় করিয়ে ফেলেছেন। তিনি ক্ষমতা নেবার পর থেকে প্রতিটি পদোন্নতি হয়েছে জ্যেষ্ঠতা আর যোগ্যতায়। ব্যবস্থা করেছেন পুলিশের শীর্ষ পদটাও আর কখনই যেন রাজনৈতিক ভাবে নির্ধারিত না হয়। ফলাফল হাতেনাতে পেয়েছেন। পুলিশের যেই সব ভালো কর্মকর্তা ছিলেন, তারা আরও উৎসাহ পেয়েছেন। নিজের কাজটা জান বাজি রেখে করছেন। আর যারা ঠিক ছিলেন না, তাদের বেশীর ভাগই শুধরে নিয়েছেন। বাকিরা চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন।

তবে এই টুকুতেই সব সমস্যার সমাধান হয়নি। পুলিশের লোকবল জনসংখ্যার তুলনায় অতি নগণ্য। অল্প লোক দিয়ে যখন অনেক বড় কাজ সামলাতে হয়, তখন প্রযুক্তির সাহায্য নিতে হয়। এই জায়গাতায় মোজাম্মেল রফিকের সবচেয়ে বড় সুবিধা। তিনি নিজে এই লাইনের লোক হওয়াতে অল্পতেই একটা চমৎকার সিস্টেম দাড় করিয়ে ফেলেছেন। এবং পুরো কাজটা করিয়ে ফেলেছেন বিনা মূল্যে। এর আগে অনেক প্রতিভাবান তরুণ প্রোগ্রামার আর অনেক ভালো সফটওয়্যার কোম্পানিই দেশের জন্য বিনামূল্যে কাজ করতে চেয়েছে। তবে যেসব কাজে অর্থ নেই, সেখানে ভাগ-বাটোয়ারারও সুযোগ নেই। তাই কোন সরকারী অফিসই এধরনের কোন প্রস্তাব কখনই গ্রহণ করেনি। খুব সাদামাটা ইন্টারফেসে দারুণ কার্যকরী একটা সিস্টেম দাঁড়িয়ে গেছে। বিনিময় মূল্য হিসাবে কেবল সেইসব প্রতিষ্ঠান আর প্রোগ্রামারদের নাম ক্রেডিট লিস্টে রাখা হয়েছে। এখন অন লাইনে মামলা করা যায়, যেকোনো মামলার অগ্রগতি জানা যায়, ঠিক কোন জায়গায় কোন জিনিসটা আটকে আছে সহজেই বের করে ফেলা যায়। শুধু তাইনা প্রতিটি পুলিশ বা নিরাপত্তা বাহিনীর যে কোন সদস্যের কার্যক্রম মনিটর করা যায় সেই সাথে যে কারো বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগও করা যায়। পদোন্নতির ক্ষেত্রে এই সব কিছু গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা হয়। বাধ্য হয়েই পুলিশ কারো বিরুদ্ধে মিথ্যা চার্জশিট দেয় না। অযথা কাউকে আটকে রাখে না। ঘুষ চাওয়ার তো প্রশ্নই উঠে না। প্রতিটি রাস্তায় হাই ডেফিনিশন ক্যামেরায় তোলা ছবি থেকে মুহূর্তে যেকোনো রাস্তার গোলমাল ধরে ফেলা যায়। সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া যায়।

সবচেয়ে চমৎকার যে জিনিসটা তৈরি হয়েছে, তা হচ্ছে ক্রিমিনাল ডাটাবেজ। পুলিশের কোন কিছু ফাইলে রাখতে হয়না। আর দরকারের সময় খুঁজতেও হয়না। প্রতিটি আসামি ধরার পর একটা এন্ট্রি যায়। সাথে ফিঙ্গার প্রিন্ট আর ছবি। প্রতিটি অপরাধীর পুরো প্রোফাইল ডাটাবেজে ঢুকে যায়। অন্য নাম আর পরিচয় বলে পার পাওয়ার উপায় নেই। প্রতিটি এন্ট্রির সময় ম্যাচ করে দেখা হয় আগে এন্ট্রি আছে কিনা। কোর্টে বিচারক যেমন সহজে আসামির আগের কার্যকলাপের খোঁজ পান তেমনি ইমিগ্রেসন পুলিশও খুব সহজেই দেখতে পারে কোন বড় অপরাধী ভুয়া পরিচয়ে পালাচ্ছে কিনা। ভবিষ্যতের নজরদাড়িতেও এটা ভালো কাজে দেবে। কোন মানুষই এক বারে বড় সন্ত্রাসী হয়না। দিনে দিনেই বেড়ে উঠে। উঠতি অপরাধীদের ট্র্যাক রাখার জন্য এর মত কার্যকর ব্যবস্থা সম্ভব না।

পৃথিবীর সব দেশেই সমান রকম ভালো আর যোগ্য লোক রয়েছে। উন্নত আর অনুন্নত দেশের পার্থক্য শুধু একটা জায়গায়। ঠিক জায়গায় ঠিক মানুষটা থাকা না থাকায়। এই দেশে হাজার সমস্যার মুল কারণও তাই। বেশীর ভাগ মন্ত্রণালয় নিজের কাজটা ঠিক মতন করতে পারে না। দেশের প্রধানমন্ত্রীকে মাঝে মাঝেই অন্য মন্ত্রী আর মন্ত্রণালয়ের কাজে হস্তক্ষেপ করতে হয় আর পরিস্থিতি সামলাতে সাফাই গাইতে হয়। যেকোনো প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে উপরের মানুষের প্রধান কাজ সব কিছু মনিটর করা। কোথাও কিছু আটকে গেলে ব্যবস্থা নেয়া। কাউকে কোন দায়িত্ব দেবার পর তাতে নাক গলানোর কোন মানে হয় না যতক্ষণ পর্যন্ত না সে নিজে থাকে সাহায্য চায় অথবা কাজটায় বার্থ হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এখন পর্যন্ত নিজের অধনস্ত কারো কাজে হস্তক্ষেপ করেননি। কেউ নিজের কাজটা ঠিক মতন কাজ না করতে পারলে কেবল সরিয়ে দিয়েছেন। মাঝে মাঝে বড় জোর নতুন কোন ধারনা দিয়েছেন, কিন্তু চাপিয়ে দেননি। যার যেটা পছন্দ হয়েছে নিজের মত গ্রহণ করেছে বা বাদ দিয়েছে। ম্যানেজমেন্টের এই সাধারণ দর্শনটা দিয়েই পুরোটা মন্ত্রণালয় সামলে নিচ্ছেন। যদিও তিনি অসাধারণ বক্তৃতা দিয়ে কাউকে মন্ত্রমুগ্ধ রাখেন না। কখনো কাউকে বকাঝকা করেন না। জোরে কথা বলা তার স্বভাবের মধ্যেই নেই। মন্ত্রণালয়ে কানাঘুষা আছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মেজাজটা তার সাথে থাকে না। বাসার ডিপ ফ্রিজে থাকে।

মোজাম্মেল রফিক জানেন কোন সমস্যা সমাধানে সমস্যার ভেতরে ঢোকা যেমন জরুরী। তেমনি কোন সিস্টেম বুঝতে হলে সিস্টেমের ভেতর ঢোকাও জরুরী। নিজের মন্ত্রণালয়ের প্রতিটি বিভাগে তিনি অন্তত একদিন করে কাজ করেছেন। সবচেয়ে সাধারণ কর্মীর সাথে। যাত্রাবাড়ী মোরে যেমন ট্রাফিকের সাথে দাঁড়িয়েছেন। তেমনি ইমিগ্রেসন পুলিশের সাথে পাসপোর্টে সিলও মেরেছেন। অবাক হয়ে খেয়াল করেছেন ট্রাফিকের কাজ মোটেও সহজ না। রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে, ধুলাবালি আর নোংরা ধোয়ায় এরা কাজ করে। তাও ওভার টাইমসহ দিনে ১৪-১৬ ঘণ্টা। সেই তুলনায় সম্মানী নগণ্য। রাস্তার রিকশাওয়ালাও ওদের চেয়ে বেশী কামায়। জ্যাম থাকলে আমরা এদের গুষ্টি উদ্ধার করি। অথচ যখন সব ঠিক থাকে মন থেকে ধন্যবাদও দেইনা। যাত্রাবাড়ী মোরে ট্রাফিক কন্ট্রোলের সময় খবর পেয়ে এলাকার মাতবর চলে এলেন। পুরানো ঢাকায় এরা যথেষ্ট প্রভাবশালী। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে তার বাসায় দুপুরে খাবার দাওয়াত দিলেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজি হলেন না। বিনীত ভাবে বললেন, এই গরিব ট্রাফিক পুলিশগুলো আমার লোক। আপনি বরং এদেরকে এক বেলা খাইয়ে দেবেন। এদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কারণেই এই মোড়টা দিয়ে গাড়িগুলো ঠিক মত চলছে। মাতবর সাহেব মন্ত্রীর কথায় অভিভূত হয়ে গেলেন। প্রতিজ্ঞা করলেন যতদিন বেচে থাকবেন, এদের না খাইয়ে নিজে খাবেন না। তিনি কথা রেখেছেন।

এদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তার ঠিক উল্টো অবস্থায় পড়েছেন রাজনীতিবিদেরা। তারা তাদের কাতারের লোক সামলে অভ্যস্ত। এই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাদের মতন না। যোগ্যতা আর কর্মদক্ষতায় তাদের চেয়ে যোজন যোজন এগিয়ে। নিজের চেয়ে বড় মাপের মানুষের সামনে সবাই মনস্তাত্ত্বিক ভাবে পিছিয়ে থাকে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সামনে বাকি মন্ত্রী আর নেতাদেরও একই অবস্থা। প্রতিরক্ষামন্ত্রীকে গ্রেফতারের পর সবাই ভেবেছিল তিনি আরও কাউকে ধরবেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ওই পথে হাঁটেননি। বেশীর ভাগ মন্ত্রী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, যদি আর কেউ এরেস্ট হয় তবে সবাই মিলে এক সাথে প্রতিবাদ করবেন, প্রয়োজনে একযোগে পদত্যাগ করবেন। সেই ভাবেই সবাই প্রস্তুত ছিলেন। তাও হয়নি। মন্ত্রীসভার আর সাংসদদের থেকে তিনি পুরুপরি আলাদা থাকেন। সত্তর আর আশির দশকে ক্রিকেটে অপরাজেয় ওয়েস্ট ইন্ডিজও দলও তাই করত। মাঠে এবং মাঠের বাইরে প্রতিপক্ষের সাথে তারা মিশত না। কারো সাথে কথাও বলত না। সবদল অজানা অস্বস্তি নিয়ে ওদের মুখোমুখি হত। এই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে নিয়েও সবাই বিশেষ অস্বস্তিতে থাকে।

দেশের সবচেয়ে প্রতিভাবান মানুষগুলো হয় ডাক্তার বা ইঙ্গিনিয়ার। তারপরের সারির লোকেরা বিসিএস দিয়ে সরকারী চাকরিতে ঢুকে। যারা কোনদিনই কিছু করতে পারেনি, অল্প বয়সেই বখে গেছে আর মাঠে ঘাটে পড়ে থেকেছে তারা বনে গেছে রাজনীতিবিদ। আর রাজনীতিবিদ থেকে মন্ত্রী এমপি। পুরো সিস্টেমই উল্টো করে সাজানো। দেশ এমনি এমনি উল্টো পথে হাটে না। উল্টো সিস্টেমের কারণেই হাটে। বেশিরভাগ নেতাই সুদ্ধ বাংলায় কথা বলতে পারেন না। ভদ্রটা শব্দটা অনেক দূরের ব্যাপার, সাধারণ সৌজন্য বোধও একেবারেই অনুপস্থিত। কেবল মাত্র অল্প কিছু রাজনীতিবিদই এর ব্যতিক্রম। সম্ভবত এদের কারণেই দেশটা এতো দিন টিকে আছে। এই অল্প সংখ্যক লোকই নৈতিকভাবে আর পেছন থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন। এই লোকটা মাত্র ৯ মাসে দুর্নীতির সূচকে দেশকে অনেক নীচে নামিয়ে ফেলেছেন। কেবল মাত্র দুর্নীতিমুক্ত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের কারণেই দেশের দুর্নীতির হার এক তৃতীয়াংশে নেমে গেছে।

এই দিকে বিরোধী দলের অবস্থা আরও খারাপ। আন্দোলনের সফলতা আসে ভাংচুর আর ত্রাস সৃষ্টির মাধ্যমে। যার কিছুই করা যাচ্ছে না। পুলিশ মিছিলে বাধা দেয়না। অযথা বিরোধী দলের কাউকে গ্রেফতারও করে না। আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতিও খারাপ না। দলীয় মিছিল মিটিঙে ককটেল বোমা নিয়ে কেউ আসতে পারে না। আন্দোলনের জন্য ইস্যুও পাওয়া যাচ্ছে না। বড় নেতারা উল্টো নিজেদের আগের দুর্নীতি নিয়েই বেশী চিন্তিত থাকছেন। আর পত্রিকাগুলোও তাদের খবর ছাপে না। পল্টন ময়দানে তারা কি বলছেন এর চেয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর চমক নিয়েই প্রধান সংবাদপত্রগুলো ব্যস্ত। এই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পুরো মেয়াদে ক্ষমতায় থাকলে আগামী বারও একই সরকার ক্ষমতায় থাকবে। তাদের কোন আশাই থাকবে না।

আষাঢ়ে গল্পঃ প্রথম পর্ব

আষাঢ়ে গল্পঃ দ্বিতীয় পর্ব

চলবে…………

দৃষ্টব্যঃ এই গল্প ভবিষ্যতের। আমাদের স্বপ্নের কোন এক ভবিষ্যতের। যে ভবিষ্যতের স্বপ্ন আমরা বুকে লালন করি না। সেই ভবিষ্যত কখনই আমাদের সামনে বাস্তব হয়ে আসবে না। হোকনা স্বপ্নটা আষাঢ়ে গল্প।



আষাঢ়ে গল্প, গল্প 4 comments

আষাঢ়ে গল্পঃ দ্বিতীয় পর্ব

আষাঢ়ে গল্পঃ প্রথম পর্ব

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে বেড়িয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সোজা পুলিশ কন্ট্রোল রুমে চলে এলেন। তিনি কখনো সন্ধ্যার পর অফিসে থাকেন না। তবে আজ থাকতে হবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানেন তিনি ভীমরুলের চাকে ঢিল ছুড়েছেন। ২/৪ টা কামড় তাকেও খেতে হবে। তবে এক ঢিলে পুরো চাক ভাংতে হবে। কোন ভুল করা চলবে না। কাল সকাল পর্যন্ত সময়টা গুরুত্বপূর্ণ। বেশির ভাগ নেতা রাজনীতি করেন নিজের স্বার্থের জন্য। দেশ বা দল গুরুত্বপূর্ণ না। স্বার্থের বাইরে গেলে দলের বিরুদ্ধে যেতে এক মুহূর্ত সময় লাগবে না। এখন ঠিক তাই ঘটবে। এমন না যে প্রতিরক্ষামন্ত্রী একাই দুর্নীতিগ্রস্থ বা ঘুষের টাকা তিনি একাই খেয়েছেন। পুরো ব্যাপারটার সাথে অনেকেই জরিয়ে আছে। প্রতিরক্ষামন্ত্রীকে এরেস্ট করা আসলে বাকিদের একটা বার্তা দেওয়া। কেউ নিরাপদ না। সাড়ে ৪ টার মধ্যে দলীয় কার্যালয় থেকে মিছিল বের হল। যদিও আসল উদ্দেশ্য মিছিল না। মিছিলের নামে গাড়ি ভাংচুর।

পুলিশ রাস্তা আটকাল না। মিছিলেও বাধা দিল না। শুধু কিছুদুর আগানোর পর মাইকে ঘোষণা দেয়া হল। শান্তিপূর্ণ মিছিলে বাধা দেওয়া হবে না। তবে কেউ ভাংচুরের সামান্য চেষ্টা করলে সরাসরি গুলি করা হবে। প্রমাণ হিসাবে ভিডিও রেকর্ড থাকবে। এমন ঘোষণা কেউ আশা করেনি। দলের নেতারা বিভ্রান্ত হয়ে গেলেন। উপরে তাকিয়ে মারদাঙ্গায় ওস্তাদ পিকেটারের দল চুপসে গেছে। সত্যি সত্যি স্নাইপার টিম অস্ত্র তাক করে আছে। কেউ বাধা দেয়নি, মিছিল আপনা আপনি থেমে গেছে। সিদ্ধান্তহীনতা পুরো মিছিল কে থামিয়ে দিয়েছে। মন্ত্রী হবার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শহরের নিরাপত্তার জন্য আগের সরকারের প্রস্তাবিত পুলিশের জন্য ১০০০ কোটি টাকার হেলিকপ্টার ক্রয় প্রকল্প বাতিল করেছেন। এই দেশ ইউরোপ/আমেরিকা না। এখানে হেলিকপ্টারে সন্ত্রাসী তাড়া করা সম্ভব না। ঘুপচি অলিগলি হেলিকপ্টার দিয়ে নজর দেয়া যায়না। এর বদলে মাত্র ৫০ কোটি টাকায় আধুনিক অস্ত্রসহ একটা চৌকস স্নাইপার টিম বানিয়েছেন। গত পাঁচ মাসে এদের প্রশিক্ষণ শেষ হয়েছে। আজ এর সুফল হাতেনাতে পাওয়া গেছে।

প্রথম প্রতিক্রিয়া চমৎকার ভাবে সামলান গেছে। শুধু তাই নয়। মিছিল আর ভাংচুরের মত এমন কার্যকর অস্ত্র এভাবে ভেস্তে যাবে কেউ আশা করেনি। প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর পক্ষের লোকজন ধাঁধায় পরে গেছে। তার নিজ এলাকায় পর্যন্ত আর কোন মিছিল বের হয়নি। সন্ধ্যার পর দ্বিতীয় সম্ভাব্য গণ্ডগোলের ব্যাপারে আগেই ব্যবস্থা করা আছে। রাতের অন্ধকারে গাড়িতে আগুন দেয়ার কাজ গুলো করানো হয় বস্তির ছোট খাটো উঠতি মাস্তানদের দিয়ে। যাদের বেশীর ভাগই মাদকাসক্ত। অল্প কিছু টাকার বিনিময়ে এদের দিয়ে গাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হয়। বেঁচে থাকার জন্য এদেরকে কিছু বড় ভাইয়ের ছায়ায় থাকতে হয়। গত এক সপ্তা ধরে এই সব বড় ভাইদের ধরে এনে যথেষ্ট আপ্যায়ন করা হয়েছে। কোন কাজের অর্ডার আসলে সাথে সাথে জানাবে। পুরো বিষয়টা অল্প কিছু লোকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকায় আগে থেকে কেউ কিছু টের পায়নি। বিকালের মধ্যে টাকা বিলি হয়েছে কিন্তু রাতে কোন গাড়ি পোড়েনি।

রাত ৮ টা। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পুলিশ কন্ট্রোল রুমের বারান্দায় বসে কফি খাচ্ছেন। নির্দিষ্ট সময় পর পর মগে চুমুক দিচ্ছেন। মাঝের সময়টাতে মগটা টেবিলে রাখছেন না। মুখ থেকে কিছুটা সামনে কনুইয়ের সাথে ৩০ ডিগ্রি কোনে ধরে রাখছেন। যাতে কফির গন্ধটা পুরোটা সময় জুড়েই পাওয়া যায়। এমন সময় র‌্যাবের ডিজি ওমর আলি এলেন। যদিও র‌্যাবের বেশীর ভাগ কর্মকর্তা সামরিক বাহিনীর তবে ডিজি পুলিশের। আগাগোড়াই পুলিশের। ডিজির চেহারা দেখে বোঝা যাচ্ছে কোথাও কোন গোলমাল হয়েছে। তিনি শক্ত মুখে তাকিয়ে আছেন। অবশ্য তিনি সব সময়ই শক্ত মুখে থাকেন। গুরুত্বপূর্ণ কিছু হলে চোখের পলক পড়া থেমে যায়। এই মুহূর্তে ডিজি সাহেবের চোখের পলক পরছে না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাড়াহুড়ো করলেন না। ধীরে সুস্থে কফি শেষ করলেন। এতক্ষণে আইজি সাহেবও চলে এসেছেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীঃ বলুন ওমর সাহেব।
ডিজিঃ কাল সকালে কোর্ট কাচারির সব গুলো রাস্তা নেতা কর্মীদের দিয়ে আটকে ফেলা হবে যাতে সকাল ৯ টার মধ্যে প্রতিরক্ষামন্ত্রীকে আদালতে হাজির না করা যায়। বিভিন্ন জেলা থেকে লোক আনা হচ্ছে। ইতিমধ্যে অনেকেই ঢাকা চলে এসেছে। সকালের মধ্যেই লাখ ছাড়াবে।
আগে কাউকে এরেস্ট করলে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কোর্টে হাজির করতে হত। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজে উদ্যোগ নিয়ে সময়টা ২৪ ঘণ্টায় এনেছেন। কোন মানুষেরই বেশি সময় পুলিশ হেফাজতে থাকা উচিৎ না। হয় কোর্টে যাবে নতুবা ছেড়ে দেয়া হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীঃ আপনাদের কোন পরিকল্পনা আছে?
আইজিঃ আমাদের জনবল কম। এমনিতেই নাশকতার আশংকায় সারা শহরে পুলিশ ছড়িয়ে দেওয়া আছে। কোর্ট কাচারির পুরো রাস্তার নিয়ন্ত্রণ নিতে হলে তাদের সবাইকে সরিয়ে আনতে হবে। পুরো শহরের নিরাপত্তায় ছাড় দিতে হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানেন এমনটা সম্ভব না। এই সুযোগ কিছুতেই হাতছাড়া করবেনা প্রতিরক্ষামন্ত্রীর লোকজন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীঃ আর কোন প্লান?
ডিজিঃ ঢাকায় ঢোকার সব রাস্তা বন্ধ করে দেয়া যায়।
জনদুর্ভোগ কোন ভাবেই কাম্য না। সাধারন মানুষকে নাজেহাল করা কখনই উচিৎ না। সেই অধিকার কেউ তাকে দেয়নি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সায় দিলেন না।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীঃ আর কিছু?
ডিজিঃ এখনো পর্যন্ত না।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চিন্তিত মুখে উপর দিকে তাকালেন। বড় ৪২ ইঞ্চির স্ক্রিনে টিভি চলছে। জুয়েল আইচের পুরনো এক জাদুর অনুষ্ঠান চলছে। একটা খালি বাক্স থেকে যাদু দিয়ে বল বের করে আনছেন। প্রথমে খালি বাক্স দেখান হচ্ছে। তারপর একে একে নানান রঙের বল বের করা হচ্ছে। যাদুর প্রাচীনতম কৌশল। বলগুলো আসলে আগেই বাক্সের ভেতর থাকে। শুধু মানুষের চোখকে ধোঁকা দেওয়া হয়। হঠাৎ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মুখে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। ডিজির দিকে তাকালেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীঃ ওমর সাহেব। আগামী এক ঘণ্টার মধ্যে র‌্যাবের মেজর থেকে ক্যাপ্টেন পদমর্যাদার সেরা ১০ জনের তালিকা দিতে পারবেন? তাদের ফুল প্রোফাইল সহ?
ওমর আলি বুঝলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কোন পরিকল্পনা আছে এবং তিনি এখন তা জানাতে চাচ্ছেন না। পারব বলে বারিয়ে গেলেন। এক ঘণ্টার মধ্যে ফাইল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর হাতে আসলো।

সকাল সাড়ে ৮ টা। কোর্ট কাচারির আশেপাশের সব রাস্তা বন্ধ হয়ে গেছে। নেতাকর্মীরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিরুদ্ধে শ্লোগান দিচ্ছে। প্রতিরক্ষামন্ত্রীর নিঃশর্ত মুক্তি চেয়ে রাস্তা গরম করছে। এতো মানুষ হবে কল্পনাও করা যায়নি। শহরের সব পুলিশ দিয়েও এদের সরান যেত না। পুলিশের গাড়ি কোর্টের ২ কিলোর মধ্যেও আসতে পারেনি। অবরোধ কারীরা রাস্তায় ঠায় বসে আছে। তারা চাইলেই মন্ত্রীকে গাড়ি থেকে ছিনিয়ে নিতে পারে। তবে সে ব্যাপারে নিষেধ করা আছে। এমনিতেই কোর্টের সময় পার হলে মন্ত্রীকে পুলিশের ছেড়ে দিতে হবে। শুধু শুধু ঝামেলা পাকানোর মানে হয়না।

৯ টা বেজে গেছে। নেতা কর্মীরা উল্লাস করছে। পুলিশ তাদের সরাতে পারেনি। অবশ্য সরানর চেষ্টাও করেনি। হয়তো বুঝেছে লাভ নেই। এমন সময় কোর্টের পুলিশ ক্যাম্প থেকে প্রতিরক্ষামন্ত্রীকে বের করে আদালতে হাজির করানো হল। সরকারী দলের আইনজীবীরা ধাঁধায় পড়ে গেছে। মন্ত্রীকে কখন কোর্টে আনা হল এবং কিভাবে কেউ বুঝতে পারছে না। আদালত জামিন না মঞ্জুর করে প্রতিরক্ষামন্ত্রীকে জেল-হাজতে পাঠালেন। খবর ছড়িয়ে পরতে সময় লাগলো না। পুলিশের গাড়িতে প্রতিরক্ষামন্ত্রী ছিলেন না। হতবাক অবরোধ কারীরা রাস্তা ছেড়ে দলীয় কার্যালয়ের দিকে চলল। কি হয়েছে জানা দরকার।

ঘটনা তেমন বিশেষ কিছু হয়নি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর র‌্যাবের মেজর থেকে ক্যাপ্টেন পদমর্যাদার সেরা ১০ জনের তালিকা থেকে ২ জনকে বের করলেন। রাতের অন্ধকারে তাদের দিয়ে খুব সাধারণ ভাবে প্রতিরক্ষামন্ত্রীকে কোর্টের পুলিশ ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেওয়া হল। এর আগে ক্যাম্পের সব পুলিশকে সরিয়ে আনা হল রাজারবাগে। র‌্যাবের সেরা ২ জনকে রাখা হয়েছিল যেন কোন বিশেষ পরিস্থিতিতে অবস্থা সামাল দেওয়া যায়। আইডিয়াটার জন্য জুয়েল আইচের ধন্যবাদ পাওয়া উচিৎ।

গভীর রাতে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে দলীয় সর্বচ্চ নীতি নির্ধারকদের জরুরী মিটিং বসেছে। শীর্ষ ৫-৬ জন নেতাই কেবল আছেন। দলের বাকিরা এতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে থাকেন না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পুরো কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা হল। প্রধানমন্ত্রী নিজেও ভাবেননি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কোন মন্ত্রী পর্যন্ত যাবে। ১৫-২০ জন সাধারণ সাংসদ কে এরেস্ট করা নিয়ে তিনি চিন্তিত হননি। তবে এখন নজর দেয়ার সময় হয়েছে। একটা দল এমনি এমনি চলে না। অনেক টাকার লেনদেন চলে। কেউ নিজের টাকা এমনি এমনি দলে দেয়না। স্বার্থসিদ্ধির জন্যই দেয়। দল সরকারে এলে সুদে আসলে তা ফেরত পায়। পুরো ব্যাপারটা কাগজে কলমে হয়না। দুর্নীতির মাধ্যমেই হয়। এমন না যে এটা কেবল এই দেশেই হয়। গণতন্ত্র নামক ব্যবস্থায় পৃথিবীর অধিকাংশ দেশেই তা হয়। উন্নত দেশে নির্বাচনী তহবিল নামে একটা ব্যাপার আছে। ব্যবসায়ীরা সেখানে টাকা দেন বলা ভালো বিনিয়োগ করেন। নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এসে তাদেরকে বিনিয়োগ লাভ সমেত ফিরে পাওয়ার ব্যবস্থা করেন। এই দেশে আইন অনুযায়ী এমন কোন ব্যবস্থা নেই। নির্বাচনে প্রার্থী জেতে ভোটের জোরে। ভোটের জোর বাড়াতে টাকার জোর আবশ্যিক। কোন সৎ প্রার্থী নির্বাচনে দাঁড়ালে ভোট পাবে না। এক লোক এক ভোট। এই এক একজন মানুষকে চেনাতে, মানুষের বাড়ি বাড়ি যাওয়া, পোষ্টারিং আর সভা সমাবেশ করতেও টাকা লাগে। এই দেশে সৎ ভাবে এতো টাকা জোগাড় করা কম মানুষের পক্ষেই সম্ভব। হুট করে কাউকে সরিয়ে দিলে অনেক ঝামেলার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মত জনপ্রিয় কারো ক্ষেত্রে সমস্যাটা আরও বেশী। সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিলেন অপেক্ষা করার। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেও মানুষ, ভুল সে করবেই। যথা সময়ে সেই ভুলের ফয়দা তোলা হবে। এই লোক রাজনীতির ভেতরের লোক না। নিশ্চিত ভাবেই মারপ্যাঁচ বুজবে না। আপাতত দলীয় ভাবে খানিকটা কোণঠাসা করা হবে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির বৈঠক চলছে। কমিটির চেয়ারম্যান বেশ প্রস্তুতি নিয়ে এসেছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে নাজেহাল করার জন্য। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সম্পর্কে খোঁজ খবর নিয়েই এসেছেন। এতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় থেকে এই লোক বিকাল ৫ টার পর অফিসে থাকেন না। অফিস টাইমের বাইরে কেবল মাত্র প্রধানমন্ত্রী আর পুলিশের আইজি ছাড়া আর কেউ তার সাথে যোগাযোগ করতে পারেন না। চেয়ারম্যান সরাসরি মন্ত্রীকে প্রশ্ন করছেন।
চেয়ারম্যান: আপনাকে তো বিকাল ৫ টার পর আর পাওয়া যায়না। আমি নিজে আপনাকে দরকারের সময় আপনাকে ফোন দিয়ে পাইনি। এতোটা গা ছাড়া হলে এমন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় ঠিক ভাবে চলবে কি করে?
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীঃ যেকোনো পরিস্থিতি সামলানোর জন্য পুলিশ, র‌্যাব আর অন্যান্য বাহিনী রয়েছে। আমাকে তখনি দরকার হবে যখন এই সবগুলো একেবারেই কাজ করবে না। এবারে বলুন এমন কি অবস্থা হয়েছিল যার জন্য আপনার আমাকে দরকার হল?
কমিটির চেয়ারম্যান এমন জবাব আশা করেননি। আসলেই এমন কিছু হয়নি। তিনি কোন কথা খুঁজে পেলেন না। খানিকটা হাসার চেষ্টা করলেন পরিস্থিতি সামলাতে। কাজে দিল না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তার দিকে সরাসরি তাকিয়ে আছেন গম্ভীরভাবে। কমিটির বাকিরাও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে অনুসরণ করছে। এই লোকটা সব গোলমাল করে দিচ্ছে। সে রাজনীতির বাইরের লোক। তার হিসাব নিকাশও আলাদা। নেতারা কিছুই ধরতে পারছেন না। চিন্তার বাইরের সবকিছু করে বসে আছে। কিছুতেই ঠেকান যাচ্ছে না। তার উপর তার কোন অতীতই নেতারা জানেন না। আগের কোন দুষ্কর্মের ভয়ও দেখান যাচ্ছে না।

চলবে…

আষাঢ়ে গল্পঃ প্রথম পর্ব

দৃষ্টব্য: এই গল্প ভবিষ্যতের। আমাদের স্বপ্নের কোন এক ভবিষ্যতের। যে ভবিষ্যতের স্বপ্ন আমরা বুকে লালন করি না। সেই ভবিষ্যৎ কখনই আমাদের সামনে বাস্তব হয়ে আসবে না। হোকনা স্বপ্নটা আষাঢ়ে গল্প।



আষাঢ়ে গল্প, গল্প 8 comments