Archive for November 26, 2013

ট্রাভেল লগ: ইউএস ট্রিপ : সেপ্টেম্বর ২০১৩

সেপ্টেম্বর ৭, ২০১৩:
ক্যালিফর্নিয়া থেকে গতবারের রিটার্ন ট্রিপটা মোটেই সুবিধার ছিল না। সকাল ১০ টায় ঘুম থেকে উঠে বিকাল ৪ টার ফ্লাইটে উঠেছি। ক্লান্তি না থাকার কারণে পুরোটা সময় আর ঘুম আসেনি। ১৫-১৬ ঘন্টার ফ্লাইটে যদি একেবারেই ঘুম না আসে তো সময় মোটামুটি থেমেই থাকে। ২ মিনিট পরপর ঘড়ি দেখবেন আর ভাববেন আর কতক্ষণ। এইবার আর গতবারের ভুল করিনি। খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে গেছি। রাত ৯:৩০-এ দুবাইয়ের ফ্লাইটে একেবারেই ঘুমাইনি। স্যান ফ্রান্সিসকোর পরের ফ্লাইটে ঘুমানোর জন্য চেষ্টাও করতে হয়নি। এক ঘুমে ৪ ঘন্টা পার। বাকিটা সময় ৪ টা মুভি দেখেই কেটে গেছে। অনেকদিন ধরে মুভি না দেখায় বেশ কিছু ভালো মুভি জমে গিয়েছিল।

সেপ্টেম্বর ৮, ২০১৩:
আমেরিকার মত পৃথিবীর ঠিক অন্য প্রান্তের দেশে যাওয়া আসার পথে সময়ের একটা মজার খেলা টের পাওয়া যায়। অন্য অনেক দিকেই আমরা পিছিয়ে থাকলেও সময়ের হিসাবে আমরা প্রায় ১২ ঘন্টা এগিয়ে :) যেমন আমি ঢাকা থেকে রওনা দিয়েছি ৭ তারিক রাত ৯:৩০ মিনিটে। ৫ ঘন্টায় দুবাই পৌছেছি। তারপর ৮ ঘন্টার ট্রানজিট। আবার দুবাই থেকে স্যান ফ্রান্সিসকো ১৬ ঘন্টার ফ্লাইট পার করেও আমি স্যান ফ্রান্সিসকো পৌছেছি ৮ তারিক দুপুর ১টায়।

সেপ্টেম্বর ৯, ২০১৩:
So you are the young rich man? বাস ড্রাইভারের কথার কিছুই বুঝলাম না। মেরিন হেডল্যান্ড থেকে হেটে গোল্ডেন গেট ব্রিজের কাছে এসে কোনো গাড়ি পাচ্ছি না। স্যান ফ্রান্সিসকো ব্রিজের অন্য পারে। অনেকক্ষণ পর একটা টুরিস্ট বাস ওই পারে যাবে শুনে উঠে পরেছি। উঠতে না উঠতেই ড্রাইভারের আজব প্রশ্ন। বললাম মানে? বলল you www.com guy. আমি এই মেক্সিকানের অনুধাবন ক্ষমতায় মুগ্ধ। বললাম হা। কিন্তু আমি rich man হলাম কি করে? বলল তুমি একা মানুষ, বছরে ১০০ কামাও। তুমি অবশ্যই রিচ। বললাম আমি এখানে থাকি না। বাংলাদেশ থেকে এসেছি। লোকটা বেশ মজার। কথা দিয়ে সবাইকে মাতিয়ে রাখলো। একসময় বলল: মানুষ এই সুন্দর শহরটায় আসে আর জেলে যেতে চায়। People come to this beautiful city and wanna go to jail (alcatraz prison)।

ব্রিজের অন্য পারে যাবার আগে Sausalito city ঘুরিয়ে নিয়ে গেল। আমার দেখা সবচেয়ে ছোট্ট ছিমছাম শহর। পাহাড়ের কোল বেয়ে সাজানো গোছানো ঘর বাড়ি। দেখে মনে হলে কোনো মহান চিত্রকর আগে ছবি একেছে। তারপর সেই মত শহরটা বানিয়েছে।

সেপ্টেম্বর ১০, ২০১৩:
আপনি শুধু মাত্র আমেরিকান এক্সপ্রেসের ক্রেডিট কার্ড বাবহার করলে স্যান ফ্রান্সিসকোতে আপনাকে ক্যাশের উপরই চলতে হবে। মিউনি, বার্ট কোনো ট্রেন বাসেই এটা নেয় না। ছোট ছোট খাবার দোকানেও এর এক্সেস নেই। এমন কি ইউএস এয়ারওয়েজের কাউন্টারেও চালাতে পারলাম না।

বৃষ্টি হচ্ছে, ঠিক মুষলধারেও না আবার ঝিরঝিরে বৃষ্টিও না। ঠিক সিনেমায় যেমন বৃষ্টি দেখা যায় অনেকটা তেমন। যাতে বৃষ্টির মধ্যে নায়ক নায়িকার চেহারা পুরোপুরি বোঝা যায়। (অবশ্য বাংলা বা হিন্দি সিনেমায় আরো অনেক কিছুই বোঝাতে হয়।) স্যান ফ্রান্সিসকো থেকে ওমাহা যাবার পথে ফিনিক্স (অ্যারিজোনা) এয়ারপোর্টে বসে বৃষ্টি দেখছি। ঠিক মনমত হচ্ছে না। বৃষ্টি শুধু দেখলেই হয় না। এর মধ্যে উপভোগ করার ব্যাপারও আছে। বৃষ্টি উপভোগের নিয়ম হচ্ছে আপনাকে এমন কোথাও বসতে হবে যাতে বৃষ্টির ঠান্ডা বাতাস আপনার গায়ে লাগে। সবচেয়ে ভালো হয় যদি ভেজা পানির ঝাপটা একটু পরপর আপনার মুখে লাগে। এয়ারপোর্টের বন্ধ গ্লাসের দেয়ালে ব্যাপারটা সম্ভব হচ্ছে না, মানে ঠিক যুইত (খাটি বাংলায়) মত বৃষ্টিটা উপোভোগ করতে পারছি না।

সেপ্টেম্বর ১৪-১৬, ২০১৩:
৩ দিনে কয়টা শহর ঘোরা সম্ভব? আমরা ১২ টা (Omaha, Council Bluff, Sioux City, Yankton, Jasper, Vermillion, Sioux Falls, Pipestone (county), Marshall, Minneapolis, Prescott, Des Moines) ঘুরেছি, তাও ৫টা স্টেট মিলিয়ে। ঘোরা বলতে আসলে ডাউনটাউন আর আশপাশ ঘোরা। তাওতো খারাপ না। স্টিফেন বেচারা টানা ৩ দিন, দিন-রাত ড্রাইভ করে গেছে।

সেপ্টেম্বর ১৭, ২০১৩:
আজ সকাল সকাল লজ্জার মধ্যে পরলাম। একেকদিন একেক স্টেটের ফাইনান্স ডিরেক্টররা আসে। গতদুদিন ধরে আসছে ম্যাট নামের এক হাসিখুসি ভদ্রলোক। কাজের ফাকে ফাকে গল্প গুজব করে। বাংলাদেশ থেকে এসেছি শুনে এসছে শুরুতেই বাংলাদেশ নামটা দিয়ে গুগল করলো। আমাদের পতাকা আর মানচিত্রটাও দেখে নিল। সে শুনেছে নেপাল আর ভুটান নাকি খুব সুন্দর। ভুটানের টাইগারস্ নেস্টের নামও সে শুনেছে, ছবিও দেখেছে। তার সেখানে যাবার খুব ইচ্ছে। মানচিত্র দেখে বলছে তোমরা তো যখন তখন ড্রাইভ করেই নেপাল আর ভুটান যেতে পার। বললাম পারতাম যদি ভারত দিত। আজ সে তার ফোনে বাংলাদেশের খবর বের করেছে। মনে হয় কাল পরশুর কোনো এক হরতালের দিনের ছবি। এক লোককে বাইক থেকে নামিয়ে ৫-৬ জন মিলে লাঠি দিয়ে পেটাচ্ছে। ম্যাট জিগ্গেস করল লোকটা কি করেছে? ভদ্রলোককে কিভাবে বোঝাই এই দেশে আপনার কোনো দোষ না থাকলেও অনেকে মিলে আপনাকে পেটাতে পারে, সাধের গাড়িটা ভাংতে পারে, অথবা বিশ্বজিতদের মত জানেও মেরে ফেলতে পারে।

সেপ্টেম্বর ১৯, ২০১৩:
প্রায় দুসপ্তা ধরে এই দেশটায় আছি। উইকডেইজে ৮টা – ৫টা মিটিং করছি। আমার ভুলভাল ইংরেজি দিয়ে কোনোমতে কাজ চালাচ্ছি। উইকএন্ডে ঘুরে বেড়াচ্ছি। ভালো ভালো রেস্টুরেন্ট খুজে ডিনার সারছি। ঝকঝকে তকতকে রাস্তাঘাটে হাটছি। খুব নিয়ম মেনে সাজানো শহরগুলো দেখছি। হোটেলে হোটেলে থাকছি। মোটামুটি চমত্কার চলার কথা। কিন্তু চলছে না। কোথায় যেন একটা কমতি আছে। চারি দিকে সবই আছে তবু কি যেন কি নাই। এটাকে মাটির টান বলে না প্রানের টান বলে জানি না তবে এ বড় কঠিন টান। এই টান প্রকাশ করার ক্ষমতা আমাদেরমত সাধারণ মানুষকে দেয়া হয়নি। কেবল কবি-সাহিত্যিকদের দেয়া হয়েছে। পরমকরুণাময় তার অপার করুনা সমান ভাবে ছড়াননি। পক্ষপাতিত্ব ছিল।

সেপ্টেম্বর ২২, ২০১৩:
আমেরিকার গত ২ ট্রিপের ৪ ইমিগ্রেসনের ৩ বারই যেই প্রশ্ন শুনতে হল তা হচ্ছে, তুমি কি ডাক্তার? আমি উত্তর দেই, আমরা মোহাম্মদ কে সংক্ষেপে Md. লিখি। এই বারের বৃদ্ধ মহিলা আরেক কাঠি সরেশ। মোটামুটি চার্জ করার সুরে জিগ্গেস করলো, পুরোটা লিখনা কেন? এটা কনফিউজিং। বললাম তোমাদের কাছে মিস্টারের সংক্ষেপ Mr. যেমন কনফিউজিং না। আমাদের কাছেও মোহাম্মদ এর সংক্ষেপ Md. কনফিউজিং না। মহিলা আর কিছু বলল না।



Travel log (ট্রাভেল লগ), USA , No comments

কৃষ্ণ গহ্বর

১৭৫৭ (পলাশীর যুদ্ধ থেকে) থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত বৃটিশ রাজ আর ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ তক পাকিস্তানি শাসন। কেবল গোলামি করেই চলে গেছে ২১৫ বছর। প্রজন্মের হিসেবে কম করে হলেও নয় কি দশ। এমন দীর্ঘ সময়ে সবই বদলায়। মানুষের আচার আচরণ তো অবশ্যই। এতটা দীর্ঘ সময় সাধারণ মানুষেরা বেচে থেকেছে পোকা মাকড়ের মত। এখানে বেচে থাকাটাই সফলতা। বেচে থাকাটাই যে শেষ কথা। বেচে থাকতে গিয়ে বিসর্জন দিয়েছে স্বাধীন সত্তা। ভালখারাপ বিচার করার ক্ষমতা।

গোলামেরা বেচে থাকে মনিবের মর্জিতে। যেকোনো মূল্যে তুষ্ট করে। এই দেশের সাধারণ মানুষও তাই করেছে। ধুতি পাঞ্জাবি ছেড়ে স্যুট টাই পরেছে। মনিবের ভাষায় কথা বলতে তার চেয়েও ভালো ইংরেজি শিখেছে। ভালো একখানা চাকরির আশায় মনোযোগ দিয়ে লেখাপড়া করেছে। স্বাধীনভাবে নিজে কিছু করার চেতনাটাই হারিয়ে গেছে। যাইহোক, তারপর এই স্বাধীনদেশে ৪৩ বছর কেটে গেছে। অনেক অনেক দিন কাটলেও সেই সত্ত্বা ফেরত আসেনি। এখনো সন্তান জন্মালে বাবা-মা সপ্ন দেখেন ছেলে-মেয়ে ডাক্তার হবে, ইঞ্জিনিয়ার হবে। বড় হয়ে চাকরি করবে। মাস গেলে বেতন মিলবে। খুব জানতে ইচ্ছে করে, আপনারা কেউ কি এমন বাবা মা চেনেন যে সপ্ন দেখেছে তার ছেলে-মেয়ে আর কিছুই না হোক অন্তত ভালো মানুষ হবে?

মানুষ যা মন থেকে চায় আর চেষ্টা করে যায় তাই পায়। আমাদের আগের প্রজন্ম যা চেয়েছে তাই পেয়েছে। এই দেশ ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ারে ভরে গেছে কেবল সত্যিকারের ভালো মানুষের দেখা মেলে না। আমাদের পরিপাটি চেহারার পেছনে যেই মনটা সেখানে কেবলি অন্ধকার। এই অন্ধকার বিশ্ব বৃক্ষাণ্ডের কৃষ্ণ গহ্বরের মতই। যাতে স্বার্থের কাছে সব কিছুই হারিয়ে যায়। বিবেকে বুদ্ধি থেকে শুরু করে মনুষত্ব, ন্যায়-অন্যায় বোধ কিমবা ভালো খারাপের মাঝের বিশাল দূরত্ব। কোনো কিছুরই হদিস থাকে না। পেটুক কৃষ্ণ গহ্বরটা সব খেয়ে নেয়।



Uncategorized , One comment

তুলাধুনা

শীতের বিকেলটা সুবিধার না। কেমন যেন ধরা যায় না। আসতে না আসতেই গায়েব। মনে হয় দুপুর পেরিয়েই সন্ধা নামে। বাচ্চাদের বিকেলে খেলার সময় থাকে না। বাড়ির ছাদে হইরই করে ঘুড়ি উড়ানো হয় না। ৯টা-৫টার চাকুরেদের দিনের আলোয় অফিস ছাড়া হয় না। বাড়ি ফেরার আগে সামনের টং দোকানটায় দু-চারজন মিলে মিনিট দশেক বসা হয় না। তবে আর যাই হোক ট্রাফিক জ্যামের কোনো হেরফের হয় না।

আজ সকাল থেকেই আকাশটা দেখার মত। রাশিরাশি তুলার মতন সাদা মেঘ ঢেকে আছে পুরোটা আকাশ। শীত আসার আগে লেপ-তোষক বানাবার ধুম পরে। ছাদের উপর পাটি বিছিয়ে চলে তুলাধুনা। প্রকৃতিরও বুঝি লেপ-তোষক লাগে। আকাশটা দেখে অন্তত তাই মনে হবে।

Photo Credit: Tawfiq Al Karim



Uncategorized One comment

তেলাওয়াত

৩-৪ ঘন্টার রাস্তা সাড়ে নয় ঘন্টায় পার হলে কেমন লাগে বুঝতেই পারেন। সন্ধা ৬ টায় গাড়ীতে উঠেছি, মদিনা পৌছেছি রাত সাড়ে তিন টায় (পরে জেনেছি ঘটনা ইচ্ছাকৃত। হোটেল খালি না হলে হোটেল ম্যানেজার বাস ড্রাইভারকে ১০০ রিয়াল ঘুষ দিয়ে দেরি করায়)। এখন আর ঘুমানোর মানে হয় না। হোটেলে ব্যাগ রেখে নবীর মসজিদে চলে এলাম। আজান হতেও আরো মিনিট পনেরো বাকি। নামাজ আরো দেরি। এতক্ষণ যেহেতু বসে থাকা সম্ভব না (আমার পিঠের সমস্যার কারণে) তাই দরজার পাশে দেয়াল গেষে দাড়িয়ে আছি। সারা রাত ঘুমাইনি, ঘুমঘুম চোখে এদিক সেদিক দেখছি। এই মসজিদ কাবার মসজিদের মতন না। খুব যত্ন করে বানানো। দেখতে ভালো লাগে।

হঠাৎ দরজার কাছে চোখ পড়ল। দুজন সৌদি আর্মি ( মনে হচ্ছে কমান্ডো হবে) সয়ংক্রিয় অস্ত্র হাতে দ্রুত পায়ে ভেতরে ঢুকছে। তাদের পেছনে আরো ৮-১০ জন। সবাই কালো (ফার্স্ট ব্লাড সৌদি না, আফ্রিকান বংশভুত) একটা লোককে ঘিরে হাটছে। সবাই জুতা না খুলেই ভেতরে ঢুকে পরেছে। হন্হন করে হেটে মসজিদের ভিতর দিয়ে যাওয়া শুরু করেছে। কঠিন সিকিউরিটি প্রোটোকল। নিশ্চই বড় মাপের কেউ হবে। আমিও পিছনে পিছনে হাটা শুরু করলাম। দেখে আসি লোকটা কে? পুরো দলটা মসজিদের অন্য প্রান্ত দিয়ে বেড়িয়ে গিয়ে আবার রাসূল (সা:) রওযার পাশ দিয়ে আবার ভিতরে ঢুকলো। এইবার ঢোকার সময় জুতা খুলেছে। তারপর লোকটা জমজমের পানি খেয়ে নামাজ পরাবার জায়গার দিকে গেল। বুঝলাম ইনিই ইমাম।

মদিনায় আজানের পর নামাজ শুরু হতে খানিকটা সময় নেয়। মক্কার মতন সাথে সাথেই নামাজ শুরু হয় না। ইমাম সাহেব নামাজ শুরু করেছেন। এই লোকের গলায় যাদু আছে। আমি আরবীর কিছুই বুঝিনা কেবল মোহাবিষ্ট হয়ে তার তেলাওয়াতের সূর শুনছি। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম সংগীতকে হার মানাবার ক্ষমতা এই সূরের আছে। তবে এই ইমাম খানিকটা খেয়ালি। এই যাদু তিনি প্রতিদিন দেখান না। ২/৩ দিন পরপর ফজর, মাগরিব কিমবা এশার নামাজে এই সূর শুনতে পাওয়া যায়। যার গলায় এমন যাদু আছে, তাকে এমন প্রটোকল দেয়াই যায়।



Uncategorized , No comments