অনিন্দিতা ৬

অনিন্দিতাদের বাড়িটা বেশ বড়সড়। প্রায় এক বিঘা জমির উপর আলিশান বাড়ি। মেইন গেট থেকে খুব যত্নে গড়া বাগান পার হয়ে ধবধবে সাদা রঙের বাড়ি। তার দাদা ছোট কামরা পছন্দ করতেন না। তিনি বিশ্বাস করতেন ছোট কামরায় থাকা মানুষের মনও ছোট হয়ে যায়। এই বাড়ির সবচেয়ে ছোট কামরাটাও প্রায় চারশো স্কয়ার ফিটের। বাড়ির ইন্টারনাল ডিজাইনও চমৎকার। ভেতরে বাতাস চলাচলের ভালো ব্যাবস্থা আছে। বাড়ির চারপাশ বড় গাছ আর উইন্ড ফ্লো-র কারণে জ্যৈষ্ঠ মাসের গরমেও এই বাড়ি ঠাণ্ডা থাকে।

বড় বাড়ির সুবিধা হচ্ছে, এক মাথায় কিছু হলে অন্য মাথা থেকে টের পাওয়া যায় না। এই বাড়িতে ছোটখাটো উৎসব হলে সাধারণত অনিন্দিতার ঘর থেকে টের পাওয়া যায় না। তবে আজকে বড় আয়োজন। মাঝে মাঝেই হই হুল্লোড়ের আওয়াজ আসছে। অনিন্দিতা ঘড়ি দেখল। নয়টা বাজতে এখনো পাঁচ মিনিট বাকি। সে ঠিক নয়টায় রুম থেকে বেরুবে। আজকাল রাত নয়টার আগে মানুষ দাওয়াতে হাজির হয় না। কেউ কেউ আসে দশটারও পর। আগে বেরুলে আরও বেশি সময় ধরে সবার সাথে হাসি মুখে কথা বলতে হবে। মানুষজনের সাথে ভদ্রতা দেখিয়ে গল্প করতে ভালো লাগে না। একটু পর মাথা ধরে। মুখের ভেতর উপর তালুর মাঝামাঝি জ্বলতে থাকে।

অনিন্দিতার মন আজকে বিক্ষিপ্ত। কোন কারণ ছারাই বিক্ষিপ্ত। তেমন বিশেষ কিছুই হয়নি। কোথায় কোন গোলমালও হয়নি। অনেক দিন পর পর তার এমন হয়। কারণ ছারাই মন বিক্ষিপ্ত হয়। এই অবস্থায় তার ওয়াইল্ড কিছু করতে ইচ্ছে হয়। আজ কিছু মাথায় আসছে না। ওয়াইল্ড কিছু করলে মনের বিক্ষিপ্তটা কেটে যাবে। নয়টায় রুম থেকে বের হয়ে ড্রয়িং রুমের দিকে গেল।

এখনো সবাই আসেনি। শুধু কাছের আত্মীয়স্বজন সবাই এসেছে। হইচই করে গল্প করছে সবাই। সবার সাথে দেখা করে এককোণে বসে গল্প শোনার ভান করে বসে আছে অনিন্দিতা। মাথায় ঘুরছে ওয়াইল্ড কিছু। ওয়াইল্ড কিছু।

খাবার দেয়া হয়েছে। আজকের আয়োজন রাজকীয়। পুরাণ ঢাকার মুন্নু বাবুর্চি রান্না করেছে। মুন্নু মিয়া বড় বিয়ে-সাদি ছাড়া রান্না করে না। তবে এই বাড়ি আলাদা। এরা বিকালের নাস্তা বানাতে বললেও সে এসে রান্না করে দিয়ে যাবে। সবাই বেশ তৃপ্তি নিয়ে খাচ্ছে। সে পরে খাবে। বেশি মানুষজনের সাথে খেতে ভালো লাগে না। সবাই যাবার পর আরাম করে খাবে।

হইচই ভালো লাগছে না। কেমন যেন হাঁসফাঁশ লাগছে। পাশের স্টাডির দিকে এগোল। স্টাডিতে গিয়ে খানিকক্ষণ চুপচাপ বসে থাকবে। স্টাডিতে ছোট খালু বসে আছে। এই খালু ছোট বেলায় তাকে খুব আদর করত। আশেপাশে কেউ না থাকলে কোলে জড়িয়ে কপালে চুমু খেত। তারপর বেশ সময় নিয়ে বুকের মাঝে চুমু খেত সাথে নাক ঘষত। তার আদরে গলদ ছিল।

খুব ছোট বেলায় অনিন্দিতা কিছু ধরতে পারত না। তবে মনের ভেতর কেমন যেন খটকা লাগত। যখন তার বার বছর বয়স অনিন্দিতা ব্যাপারটা ধরে ফেলে। বুকে চুমু খাবার পর অনিন্দিতা খালুর গালে চড় বসিয়ে দেয়। তারপর হাসিমুখে বলে,
Dont worry uncle. আমি আম্মু-আব্বুকে কিছু বলবনা। তবে প্রতিবার চুমু খাবার পর আপনাকে একটা চড় দিব।
তারপর থেকে এই খালু অনিন্দিতাকে ভয় পায়। এই বাসার দাওয়াতে সাধারণত উনি আসেন না। আজকে এসেছেন। খালুকে দেখে অনিন্দিতার মুখে হাসি ফুটে উঠল। সে ওয়াইল্ড কিছু পেয়ে গেছে।

খালু তাকে দেখে হাসার চেষ্টা করলো। কেমন আছ অনিন্দিতা?
ভালো। সবাই খাচ্ছে আপনি এখানে একা বসে আছেন কেন?
গ্যাসের সমস্যাটা বেড়েছে। এই সব খাবার খেলে সমস্যা হয় তাই এড়িয়ে চলি।
আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে আপনি বোর হচ্ছে। আপনি চাইলে আমার বুকে চুমু খেতে পারেন। বিনিময়ে আপনাকে কষে একটা চড় মারব। ওই দিন আপনার ডান গালে চড় দিয়েছিলাম। তারপর থেকে হাত নিশপিশ করছে। বাম গালটা বাদ গেছে।

ছোট খালুর মুখের রক্ত সড়ে গেছে। অনিন্দিতার সামনে থেকে প্রায় দৌড়ে পালালেন। সাথে সাথে বাসায় ফিরলেন। রাতে তার জ্বর আসলো। ভয়ঙ্কর জ্বর। পুরো এক সপ্তা হাসপাতালে থেকে বাড়ি ফিরলেন। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলেন আর কোনদিন এই মেয়ের সামনে যাবেন না। এই মেয়ে ভয়ংকর।



অনিন্দিতা, উপন্যাস , , No comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*