অনিন্দিতা ৮

বাইরে কোথাও খেতে যাবার প্ল্যান করলে সবার আগে যে ঝামেলাটা পোহাতে হয় তা হচ্ছে খাবার জায়গা ঠিক করা। এই শহরের খুব কম রেস্টুরেন্টই পরপর দুবার একই খাবার একই স্বাদে খাওয়া যায়। রেস্টুরেন্টের জনপ্রিয়তা বাড়ার সাথে খাবারের মান কমার যদি কোনো সূচক থাকতো, তাহলে এই শহরের বেশিরভাগ রেস্তুরেন্ট উপরের দিকেই থাকতো। এক বার একটা দোকান কোনো মতে চলতে পারলেই হলো। কোয়ালিটি ধাই ধাই করে নামবে। আর দোকানটা বনানী, বাড়িধারা বা গুলশান হলে তো কথাই নেই। চেয়ার টেবিল বসিয়ে ট্যাপের পানি গ্লাসে করে দিলেও মানুষ আসবে।

গাড়িতে উঠেই অর্ণব জিগ্গেস করলো, কৈ খাবে?
তুমি ঠিক কর।
কি খাবে?
এনি থিং।
একটা কিছু সাজেস্ট করো।
নতুন কোনো রেস্টুরেন্ট এসছে?
মনে হয় না। শুনিনি তো কারো কাছে।

বনানী ১১ নম্বর রোড, গুলশান ১ আর ২-এর মাঝে গাড়ি দুবার চক্কর দিয়ে ফেলেছে কিন্তু কোথায় খাবে ঠিক করা যাচ্ছে না। জাকির ভাই একেক রাস্তার শেষ মাথায় এসে শুধু জিগ্গেস করছে কোন দিকে যাব? ওনাকে একশো বার একই জায়গায় গাড়ি চক্কর দিতে বললেও উনি বিরক্ত হবেন না। নীচু গলায় বলবেন জী আপা। এই শহরের প্রাইভেট কারের ড্রাইভার হতে হলে অনেক ধৈযর্্য থাকতে হয়। সুপার প্যাকট্ জ্যামে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকতে হয়। কেউ হুট করে গাড়িতে স্ক্রাচ করলে ঝগড়াঝাটি করে জরিমানা আদায় করতে হয়। সবচেয়ে বড় কথা যেকোনো জায়গায় হুট করে ঘুমিয়ে পরার অভ্যাস করে সময় কাটাতে জানতে হয়। আবার ঘুমের মধ্যে যেন কেউ ডান আর বামের সাইড ভিউ মিরর খুলে না নিয়ে যায় সে ব্যাপারেও সজাগ থাকতে হয়। তবে জাকির ভাইয়ের ধৈযর্্য মনে হয় আরেকটু বেশি।

সেই ছোট বেলা থেকে জাকির ভাই অনিন্দিতাদের বাড়ির ড্রাইভার। ওনার বাবাও ওদের ড্রাইভার ছিলেন। নিজের ছেলে মনিরকেও উনি বলে কয়ে ওদের বাড়ির ড্রাইভার বানিয়ে ফেলেছেন। মনিরকে অনিন্দিতা ছোট থেকেই চেনে। তার বাবা মনিরকে স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিয়েছিলেন। স্কুলে নাকি সে খুব ভালো ছাত্রও ছিল। ক্লাস ফাইভে বৃত্তি পর্যন্ত পেয়েছিল। সেই ছেলে এস, এস, সি পরীক্ষার পরে পড়ালেখা ছেড়ে দিল। জাকির ভাই অতি আনন্দ নিয়ে ছেলেকে ড্রাইভিং শিখিয়ে দিলেন। ছেলে গাড়ি নিয়ে বেরুলে তিনি সুখী সুখী চেহারা নিয়ে তাকিয়ে থাকেন। কোনো এক অদ্ভুত কারণে ওনাদের রক্তের ভেতর এই পেশাটা ঢুকে গেছে।

আচ্ছা চলো এক কাজ করি। আজকে বাসায়ই খাই। অনেকদিন তোমার আমাদের বাসায় যাওয়া হয় না। আম্মু যেতে বলেছে।
ঠিক আছে চলো। অর্নবও আপত্তি করলো না।

গাড়ি আবার বনানী থেকে বারিধারার দিকে যাচ্ছে। মাঝে গুলশান ২-এ সিগন্যাল থামলো। গাড়ির জানালা দিয়ে অনিন্দিতা বাইরে তাকিয়ে আছে। সামনের লম্বা মার্কেটটা বাতি দিয়ে সাজানো হয়েছে। ঠিক বিয়ে বাড়ির মত করে। আজকে, কালকে কি কোনো বিশেষ দিন? না তাহলে তো সবগুলো বিল্ডিংই সাজানো থাকতো। একেক সারির বাতি জলছে, নিভছে, রং বদলে আবার জলছে। লাল, নিল, বেগুনি আবার লাল, নিল, বেগুনি আবার লাল, নিল, বেগুনি……

সিগন্যাল ছেড়ে গাড়ি চলতে শুরু করেছে। ফাকা রাস্তায় বারিধারার দিকে যাচ্ছে। তবে অনিন্দিতার মাথায় ঘুরে যাচ্ছে লাল, নিল, বেগুনি……



অনিন্দিতা, উপন্যাস , , No comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*