Archive for August 21, 2014

কেউ কখনোই শেখে না (শুধুমাত্র প্রাপ্ত বয়স্কদের জন্য)

শেখার নাকি দুরকমের রাস্তা আছে। কেউ দেখে শেখে, কেউ ঠেকে শেখে। তবে আমার মনে হয় কথাটা আরেকটু বাড়িয়ে বলা উচিৎ।কেউ দেখে শেখে, কেউ ঠেকে শেখে, আর কেউ কখনোই শেখে না। একটা গল্প দিয়ে শুরু করি*। এক গ্রামের এক অল্প বয়সী মেয়ে একটা বড় ভুল করে ফেলেছে। গ্রামের মাতবররা সবাই মিলে আলোচনায় বসেছে কি করা যায়। না! না!! এরা পত্রিকার পাতার খবরে আসা টাকা পয়সা খাওয়া ফতোয়াবাজ মাতবর না। নিতান্তই ভালো মানুষ। সবাই মিলে ঠিক করলেন ছোট মেয়ে বুঝতে পারেনি। তার উপর গ্রামের মান ইজ্জতের ব্যাপার। সবাই মিলে মেয়েটাকে বকাঝকা দিয়ে সাবধান করে ব্যাপারটা ধামাচাপা দিয়ে ফেললেন। কিছুদিন পর মেয়েটা আবার একই ভুল করলো। আবার সালিশ বসলো। সবাই আবারো ভাবলেন ছোট মেয়ে বুঝতে পারেনি। তার উপর গ্রামের মান ইজ্জতের ব্যাপার। সবাই মিলে আবার মেয়েটাকে বকাঝকা দিয়ে সাবধান করে ব্যাপারটা ধামাচাপা দিয়ে ফেললেন। সমস্যা হচ্ছে কিছুদিন পর মেয়েটা আবার একই ভুল করলো। এবার মাতবররা খেপে গেলেন। তাকে ডেকে ব্যাক্ষ্যা চাইলেন। বেচারী কাচুমাচু হয়ে বলল হুজুর আমার কি দোস, আমি আবার কাউরে না বলতে পারি না।

খুব সস্তা ধরনের কৌতুক দিয়ে শুরু করার জন্য দুঃক্ষিত। কিন্তু এটা ঠিক যে, সময়মত না বলতে পারাটা শুধু ভুলই না মাঝে মাঝে ভয়ংকর ভুল। ছোটবেলা থেকে অনেকেই যেই জিনিষটা একেবারেই শেখেনা তা হচ্ছে কোনো অন্যায় আবদারকে সরাসরি না বলা। নিজের লাগবে এমন অনেক জিনিস অন্য কেউ ধার চাইলে মন না চাইলেও না কি করে বলি এই ভাবনায় দিয়ে দেই। আমি অনেক মানুষ দেখেছি কেউ টাকা ধার চাইলে না তো বলতে পারেইনা, উল্টো নিজের কাছে টাকা না থাকলে পারলে ধার করে ধার দেয়। আবার ধরুন খুব শখের একটা ক্যামেরা বা লেন্স কেউ ধার চাইলো আপনি না বললেন না। ওটার ১২ টা বাজার পর আপনি ফেরৎ পেলেন। ভাবুনতো একবার কেমন লাগে? আর আপন মানুষ হলে তো আরো সমস্যা। না পারবেন বলতে আর না পারবেন সইতে। কারণ হচ্ছে এরা কখনোই মুখের উপর না বলতে পারে না। মানে কখনোই শেখে না। এই দেশে এমন মানুষের সংখ্য ব্যাপক।

আমি মাঝে মাঝেই ভাবি কারনটা কি? আপনাদের অন্য মত থাকতে পারে তবে আমার বিশ্বাস এটা হয় একটা বড় কারন আমাদের ঠিক মতন বেড়ে না উঠা। আমাদের দেশের বিপুল সংখ্যক বাবা-মা ছেলেমেয়েদের নিজের মতন করে ভালো খারাপ বিচার করার মত ক্ষমতা তৈরী হতে দেননা। আর সেইসব বাবা মায়েরা যারা গ্রাম থেকে এসে শহরে নিজের ভাগ্য গড়ার জন্য অমানুষিক পরিশ্রম করে গেছে তাদের ক্ষেত্রে সমস্যাটা আরো প্রকট। সমস্যা হচ্ছে কাজটা তারা করেন নিজের অজান্তেই। কোনকিছু বুঝিয়ে বলবার চেয়ে বকাঝকা, বল প্রয়োগ কিম্বা মারধর করে বোঝাতেই তারা বেশি আগ্রহী।

যেমন একটা বাচ্চার কিছু একটা খেতে ইচ্ছে করছে না বা সে আসলেই খেতে পারছে না। বোঝানোর কিছু নেই, মারো ধমক। কারো কোথাও যেতে ইচ্ছে করছে না। বোঝানোর কিছু নেই, মারো থাপ্পর। একটা সময় গিয়ে শিশুগুলোর নিজের ইচ্ছা অনিচ্ছার ব্যাপারগুলো পুরোপুরি উবে যায়। যেটাকে না বলা উচিত চাইলেও আর বলার অবস্থাটাই থাকে না। এরা ধীরে ধীরে না বলতে ভুলে যায়। মেয়েদের ক্ষেত্রে প্রভাবটা আরো বেশি।

কারো কারো অবস্থা তো এতটাই খারাপ হয় যে চিন্তায় পড়ে যায় না বললে অন্যজন কি মনে করবে। পরবর্তী জীবনে এর পরিনাম আরো ভয়ঙ্কর ভাবে আসে। আমি এমনও দেখেছি কোনো ভাবেই যায়না এমন সম্পর্কের ক্ষেত্রে অনেক মেয়ে হ্যা বলে দেয়, কেবল মাত্র মুখের উপর না কি করে বলবে এই চিন্তায়। অথচ এই সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার জন্য নিজের আপনজনের সাথে প্রতিনিয়ত না চাইলেও অনর্গল মিথ্যে বলে। আমার আরেকটা ধারনা হচ্ছে যেইসব বাবা মায়েরা কড়া শাসন করেন, তাদের সন্তানদের ক্ষেত্রে এই প্রবণতা অনেক বেশি। (এই ধারনাও ঠিক কিনা জানি না, আমার বেক্তিগত মতামত)।

সপ্তা দুই আগে খুব চমত্কার একটা লেখা পড়েছিলাম কারো একজনের ফেইসবুক পেইজে “যে ভাবে আমরা একটা মিথ্যেবাদী জাতিতে পরিনত হচ্ছি “। CNG তে উঠেই যে মিথ্যে বলার প্রতিশ্রুতি আমাদের মতন গাড়িহীন অধিকাংশ মধ্যবৃত্ত শ্রেণী প্রতিদিন দিয়ে যাচ্ছে, তার উপর লেখা। গতমাসে টানা তিনবার আমাকে কিছু পথ যেয়ে CNG থেকে নেমে যেতে হয়েছে একই অপরাধে (অপলো কিছু পথের ভাড়া যে দিতে হয়নি ওতেই আমি খুশি)। চতুর্থবার CNG ড্রাইভার সার্গেন্ট জিগ্গেস করলে মিটারে বলতে বলার পর মেজাজ বিগড়ে বললাম, দেখেন হজ্জ করে এসে মিথ্যে বলতে পারবনা গেলে চলেন নইলে নামায় দেন। CNG ড্রাইভার আর কিছু বললো না আমি গন্তব্যে পৌছালাম। ব্যাপারটা খটকা লাগায় পরের দুবার আবারো একই কথা বললাম এবং ফলাফল এক। ভালো হোক কিম্বা খারাপ ধর্মের ভয় এড়িয়ে না বলাটাও বাঙালি এখনো শেখেনি। এটা পরিষ্কার। দনিয়া (ঢাকা শহরের শেষ প্রান্তের সে অংশে আমি বড় হয়েছি) মসজিদের সবচেয়ে বড় চাদার অংকটা কেন এলাকায় সুদের ব্যাবসা করে আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ হওয়া লোকটার কাছ থেকেই আসে বুঝতে পারলাম।

* বি: দ্র: গল্পটি শুধুমাত্র প্রাপ্ত বয়স্কদের জন্য।



Uncategorized One comment