Tag Archive for পানাক

ট্রাভেল লগ ৫: ফুকেট ডে ৪ (জেমস বন্ড আইল্যান্ড)

হোটেলের রিসেপসনে বসে আছি। আজকের পিক-আপ ৮ টায়। মিনিট দশেক হাতে আছে। এই ফাকে হোটেলের বেশ কিছু ছবি তুললাম। সকালের আলোয় ছবি সবচেয় ভালো আসে। ভালো কিছু শট পেলাম। শেষ হতে হতেই গাড়ি চলে এসেছে। গন্তব্য পিয়ার। আজকে যাচ্ছি ফাং নাগা বে (Phang Nga Bay)। পিয়ার (Pier) থেকে স্পিড বোটে উঠবো। যাবার পথের রাস্তাটা আনারস বাগানের মধ্যে দিয়ে। দু-পাশে সারি সারি আনারস ধরে আছে। পিয়ারে যাবার পর জামায় কালকের মতই স্টিকার লাগিয়ে দিল। টনি (Tony) লিখা গোলাপি রঙের স্টিকার। কারণ আমাদের গাইডের নাম টনি। জিগ্যেস করলো কোন দেশের। বাংলাদেশ শুনে সালাম দিল। পিয়ার বোট লেগুণ মারিনার মত না। লেগুণ থেকেই স্পিড বোটে উঠা যায় না। পিয়ার থেকে স্পীড বোট পর্যন্ত প্রায় আধা মাইল। লম্বা একটা জেটি ধরে হেটে বা ভ্যানে যেতে হয়। একটা ভ্যানে করে কিছু মানুষ গেল। আমরা বাকিরা হেটেই গেলাম। এই স্পিড বোট কালকের মত না। আরো বড় আর একটু পুরনো। কোনও সিট নেই। বোটের চারপাশে বেঞ্চের মত জায়গায় সবাই বসে। প্রথমে যাচ্ছি জেমস বন্ড আইল্যান্ড।



যাবার পথটা কালকের মতই। সাগরের মাঝে খন্ড খন্ড পাহাড়। মাঝে একটা জায়গায় একদল চিল চোখে পড়ল। আমাদের বোট ঘিরে চক্কর খেতে থাকলো। কাছেই হিত ওদের ডেরা। জেমস বন্ডে পৌঁছে বোট থেকে নামলাম। চিকন একটা কনক্রিটের করিডোর দিয়ে হেটে যেতে হবে বাম দিকে। তার পর দিনে মোড় নিয়ে সোজা এগোলেই চোখে পড়ে অন্য রকম দুটো পাহাড়। দুটো পাহাড়ের পাশাপাশি আর পুরোপুরি সমতল দুই পাশ প্রায় ৩০ ডিগ্রী কোনে আর শখানেক ফুট উপরে একে অপরের সাথে হেলান দিয়ে লেগে আছে। প্রাকৃতিক কোনও পাহাড়ের পাশ এতটা সমতল কখনো দেখিনি। জেমস বন্ড দ্বীপটার আসল নাম না, আসল নাম খাও ফিং কান (Khao Phing Kan)। যার মানে হচ্ছে: “Hills leaning against each other”। হয়ত এই আজব পাহাড়ের কারণেই এই নাম। ১৯৭৪ সালে মুক্তি পাওয়া জেমস বন্ডের ম্যান উইথ দ্যা গোল্ডেন গান ছবির শুটিং হয়েছিল এখানে। তারপর থেকে খাও ফিং কান নামটা হারিয়ে যাচ্ছে।

খাও ফিং কান

একটু সামনে এগুতেই পড়ল বিখ্যাত জমস বন্ড রক। প্রায় গোল করে ঘিরে রাখা সাগরের পানির ঠিক কেন্দ্রে বেলন আকৃতির এক খন্ড পাথর। যার নিচের অংশটা সরু হয়ে সাগরে মিশেছে। যদিও পাথরটার আসল নামে কো তাপু (Ko Tapu)। নামটা এখন স্থানীয় লোকজনও ভুলতে বসেছে। এটা দেখার পর যে কারো মনে হবে জেমস ক্যামেরন এভাটার মুভির ফ্লোটিং মাউন্টেনের আইডিয়া এখান থেকেই মেরেছেন। হয়ত আসলেই তাই।

কো তাপু
কো তাপু
কো তাপু

মানুষজন এই রকে হেলান দেবার ভঙ্গিতে দাড়িয়ে জেমস বন্ডের মত দাড়িয়ে ছবি তুলছে। হাতে অদৃশ্য পিস্তল। দেখতে ভালই লাগছে। ডান দিকে বাঁশ আর শনের তৈরি সুভেনির মার্কেট। বাম দিকে সরু পাহাড়ের উঠার রাস্তা। বেশ খানিকটা উঠলে রকটার ভালো কিছু ভিউ পাওয়া যায়। ছবি তোলার জন্য ভালো জায়গা। যদিও পাথরের সিরির মত উপরে উঠার রাস্তাটা মোটেও সুবিধার না। বেশ চাপা, পাশাপাশি দুজন দাঁড়ানো যায় না। তার উপর ঝরনার পানিতে ভেজা। বেশ ভয়ে ভয়ে উঠলাম। না আবার পা পিছলে পরি। এখান থেকে জেমস বন্ড রকের আরেকটা ভিউ পাওয়া যায়। উপরে উঠে বড় একটা পাথরের উপর অল্প একটু দাঁড়ানোর জায়গা। এক দম্পতি এসেছে দুই টিনেজার মেয়েকে নিয়ে। উদ্দেশ্য বিকিনি ফটোসেশান। যথেষ্ট সময় নিয়ে ফটোসেশান হচ্ছে। সিরিতে লম্বা লাইন পড়ে গেছে। এরা সরার নাম করছে না। এত কঠিন পথ পারি দিয়ে এসেছে, এত জলদি সরার কথাও না।

সুভেনির মার্কেট

ছবি তোলা নিয়া মহা ঝামেলার মধ্যে পরেছি। গতকাল মায়া বে তে গিয়ে পড়েছিলাম এক ঝামেলায়। আমার স্ত্রীর নাকি অনেক দিনের শখ বীচের ঠিক মাঝে, সাগরের সামনে দাড়িয়ে আমাদের দুজনের ছবি তোলা। শুধু মাঝে দাঁড়ালেই চলবে না। আমাদের বাম আর ডান দিকের পাহাড়ের মাঝে যেই ফাকা জায়গাটা আকাশ আর সাগর ভাগাভাগি করে নিয়েছে, আমরা দাড়িয়ে থাকব সেখানে। এছাড়া আমাদের মাথার উপর পাহাড়ের চূড়া আর পায়ের নিচে বীচের ধবধবে সাদা বালি থাকলেই চলবে। সমস্যা হচ্ছে ব্যাপারটা ও আমাকে আগে বলেনি তার উপর আমি tripod হোটেলে ফেলে এসেছি। কাউকে দিয়ে বড়জোর ছবি তোলানো যায় কিন্তু এরকম জটিল জ্যামিতিক সমীকরণের ছবি তোলানো প্রায় অসম্ভব। তাও যদি ওরা ভালো ইংরাজি বুঝত। কপাল বেশ ভালো ছিল বলতে হবে। ঢাকা থেকে আসা এক ভদ্রলোককে পেয়ে গিয়েছিলাম। মিনিট খানেক বুঝিয়ে ছবিটা তোলা গেছে। কিন্তু আজকে পরলাম আরো বড় সমস্যায়। আজও ভোরে বের হতে হবে বলে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়েছি। আবার সকালে উঠেই বের হয়ে গেছি। তারাহুরোর মাঝে ক্যামেরা চার্জ দিতে ভুলে গেছি। জেমস বন্ড আইল্যান্ডে পৌঁছানোর পরই ক্যামেরা লো ব্যাটারির সাইন দিচ্ছে। মনে হচ্ছে পুরো দুই সপ্তা ক্লাস বাং মেরে হাজির হবার পর শুনছি আজকে মিড-টার্ম। ফ্যাকাল্টিও সুবিধার না। মেক-আপ নেবে না।

বোটে উঠার সাথে সাথেই চার্জ শেষ। অনেকের সাথেই DSLR আছে। কারো কারো সাথে চার্জারও থাকতে পারে। জিজ্ঞেস করা শুরু করলাম। ভাগ্য এবারও বেশ ভালই বলতে হবে। আমাদের সাথে ক্রোয়েশিয়ার এক দম্পতি যাচ্ছে। ওদের ক্যামেরাও Canon 500D। কি জন্য খুঁজছি শুনল। ভদ্রলোকের কাছে চার্জার না থাকলেও এক্সট্রা ব্যাটারি আছে। ওটাই দিয়ে দিল।

তারপর গেলাম Panyee Island। একটা মুসলিম গ্রাম। সাগরের মাঝে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন। একটা বড় পাহাড় ঘিরে গ্রামটা। পুরোটাই কাঠের পাটাতনের উপর। এমন না যে পানির অনেক উপরে। যেকোনো বড় জোয়ারে গ্রামটা নিশ্চিত ভাবেই ডুবে যায়। পুরো গ্রামটা ঘুরে দেখালাম। বড় একটা বস্তি বলা চলে। মানুষজন বেশ গরিব, সেই সাথে ধার্মিকও। বয়স্ক পুরুষেরা সবাই টুপি পড়ে আছে। কোন দোকানে কেউ মদ বা বিয়ার বিক্রি করে না। গ্রামের মাঝে বড় উঠানের পাশে একটা স্কুল। একটা ক্লাসে টিচার নেই। টুরিস্ট দেখে ক্লাসের বাচ্চাগুলো আমাদের দিকে ফিরে, জানালা দিয়ে Michael Jackson এর নাচের ভঙ্গিতে পোজ দিচ্ছে। ইংরেজি এস-এর মত শরীর বাকিয়ে, ডান হাত শরীরের সাথে ৪৫ ডিগ্রি কোনে, বাম হাত প্যান্টের বেল্টে। পিচ্ছিগুলো স্টাইলটা ঠিক মত ধরতে পারেনি। বাম হাত দিয়ে প্যান্টের জিপার খামচে ধরে আছে। মোটামুটি অশ্লীল ভঙ্গি।

Panyee Island
উঠানের পাশে স্কুল

দুপুরে Hong Island। লম্বা সময় এখানে কাটাব। প্রথমে লাঞ্চ, তারপর canoeing। সাগরের মাঝে বড় একটা লঞ্চের ডেকে খাবার ব্যবস্থা। খাবার পর লঞ্চের পেছন থেকে canoeing-এর নৌকায় উঠলাম। প্রতি নৌকায় ২/৩ জন করে। নৌকার মাঝি মজার মানুষ। অল্প বয়সী একটা ছেলে। বয়স বড়জোর ১৫-১৬ হবে। চেহারায় কঠিন জীবিকার ছাপ। ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংরেজিতে অনর্গল কথা বলে যাচ্ছে। চিকন একটা টানেলের মত প্রবেশ পথ দিয়ে গুহার ভিতর ঢুকলাম। নৌকায় বসেও মাথা নিচু করে ঢুকতে হয়। মাথার উপর এবড়ো থেবড়ো চোখা পাথর। একটু খোঁচা লাগলেই নিশ্চিত রক্তারক্তি। গুহার ভেতরটা অদ্ভুত, অদ্ভুত রকম সুন্দর। পাহাড়ের ভিতর গোলাকার একটা ফাকা জায়গা। মাথার উপর দিয়ে সরাসরি আকাশ দেখা যাচ্ছে না। তবে রোদের আলো ভালই আসছে। আলোর প্রতিফলনে পুরো জায়গাটা আলোকিত হয়ে আছে। মনে হচ্ছে আরেক পৃথিবীতে চলে এসেছি এক টানে। আলোর এমন খেলা এর আগে নিজের চোখে দেখিনি। বর্ণনা করার সামর্থ্য আমার নেই। দুঃখিত।

canoeing

Naka Island যাবার সময় Panak Island পাশ দিয়ে গেলাম। পাহাড়ে অনেক প্রাচীন গুহা। যেমনটা গতকালও দেখেছি। Naka Island-এ ঘণ্টা দুয়েক সময় কাটান। চমৎকার নিলো পানি আরে সাদা বালির সৈকত। তেমন ভিড়ও নেই। সৈকতে গাছের ছায়ায় সারিসারি কাঠের খাট পিছান। তবে একটা ভাড়া করা যাবেনা। জোড়া খাট ঘণ্টা প্রতি ভাড়া। যারা একলা ঘুরবে তাদেরও দুইটা ভাড়া নিতে হবে। একটা থাই নৌকা নোঙ্গর করা। বেশ সুন্দর দেখতে, আগে একটা ছবি তুলে নিলাম। ঘণ্টা খানেক সাতার কাটলাম। তারপর কাঠের খাটের উপর আয়েশ করে শুয়ে থাকা। আহা! কি আনন্দ!

Naka Island
থাই নৌকা

পিয়ারে ফিরতে ১০ মিনিটও লাগলনা। গাড়িতে করে হোটেলে পৌঁছে ছোট একটা ঘুম। রাতে শেষ বারের মত পাতং বীচ দেখতে বের হলাম। চার দিন কেটে গেছে টানের উপর। টেরও পাইনি। খুব বেশি ঘুরাঘুরি করলাম না। ভোর ৪ টায় বের হতে হবে ঠিক ৭ টায় ফ্লাইট। ভোরের অন্ধকারে এয়ারপোর্ট যাবার সময় বুঝলাম, কতটা যত্ন পায় এই বীচ। এই অন্ধকারে ঘষেমেজে রাস্তাঘাট পরিষ্কার করছে মানুষজন। আবছা আলোয় শেষ বারের মত আরেকবার দেখে নিলাম বীচটা। Good bye Patong, Hope to see you again………



Phuket (ফুকেট), Travel log (ট্রাভেল লগ) , , , , , , , , , , , , , , , , , , No comments