Tag Archive for মায়া

ট্রাভেল লগ 8: ফুকেট ডে ৩ (ফি ফি আইল্যান্ড)

অন্ধকার থাকতে থাকতেই উঠে পরেছি। হাতে খুব একটা সময় নেই। খুব জলদি বের হতে হবে। ঠিক ৭:৩০ মিনিটে হোটেল থেকে পিক-আপ। গন্তব্য বোট লেগুণ মারিনা (Boat Lagoon Marina)। ওখান থেকে স্পীড বোটে করে ফি ফি দ্বীপ আর আসে পাশের জায়গা গুলোতে ঘুরা। ফুকেটে কোন কোন দ্বীপে যাবেন আর কি ভাবে যাবেন তা নিয়ে আগে থেকে চিন্তার কিছু নেই। ফুকেটে ডজন ডজন ট্রাভেল কোম্পানি আছে। একেকটা একেক দিকের কয়েকটা করে দ্বীপে ঘুরায়। বীচের পাশের রাস্তা ঘেঁষে দোকান গুলোতে সবার ট্রাভেল আইথিনেরারি (Itinerary) আছে। কোন কোন দ্বীপে যাবেন আর বড় বোটে না স্পিড বোটে করে যাবেন ঠিক করুন। পছন্দ মত একটা বেছে নিন। ফুকেটে কেবল মাত্র খাবার রেস্টুরেন্ট ছাড়া আর সব খানেই দর-দাম ফরজ। সুতরাং নিঃসংকোচে দর-দাম করুন। যেমন আমরা ফি ফি গিয়েছি আন্দামান সীব্রীজের স্পিড বোটে। জন প্রতি ওদের রেট ৩০০০ বাথ। দর-দামের পর আমাদের দুজনের ৬০০০ বাথের জায়গায় লেগেছে ২৮০০ বাথ। ৩ ইঞ্জিনের সম্পূর্ণ নতুন স্পিড বোট। বোটে ওয়াশ রুমও আছে। সকালে মাইক্রো বাসে করে নিয়ে যাবে আর বিকালে পৌঁছে দেবে। সারা দিনে আপনার তেমন খরচ নেই। সকালের নাস্তা থেকে দুপুরের লাঞ্চ সব ওরাই দেবে। এছাড়া সব সময় খাবার জন্য পানি, জুস আর বিয়ার বরফে শীতল পানিতে ডোবানো আছে।

বোট লেগুণ মারিনায় যাবার পর সবার জামার উপরে একটা করে স্টিকার লাগিয়ে দিল। লেগুনে বিভিন্ন ট্যুরের লোকজনকে সহজে খুঁজে বের করা বা আলাদা করার ব্যবস্থা। লেগুনে ফিন (fin http://en.wikipedia.org/wiki/Swimfin) ভাড়া দেওয়া হয়। সারা দিনের জন্য ২০০ বাথ। চাইলে ভাড়া করতে পারেন তবে তেমন একটা কাজে লাগে না। ঠিক ৯ টায় স্পিড বোট ছাড়ল। সাগরে আগে কখনো স্পিড বোটে উঠিনি। চমৎকার অভিজ্ঞতা। হাই স্পিডে ঢেউয়ের উপর দিয়ে চলার কারণে বোট পানির উপরে থাকার চেয়ে হাওয়াতেই বেশি ভাসছে। ৫-৬ ফুট লাফিয়ে পার হয়ে পানিতে বাড়ি খেয়ে আবার উঠে যাচ্ছে। এই অবস্থায় বসে থাকলে পিঠের ১২ বাজবে। আমি বোটের সামনে গিয়ে দাড়িয়ে রইলাম। একেকটা বাক নেবার সময় বোট প্রায় ৪৫ ডিগ্রি বেকে যাচ্ছে।

এখন ফুকেটে পিক সিজন। সব জায়গাতেই টুরিস্ট গিজ গিজ করছে। প্রথমে যাবার কথা ছিল ফি ফি কিন্তু গেলাম খাই নাই দ্বীপে (Khai Nai Island)। তখন নাকি ফি ফি তে বোট রাখার জায়গা নাই। পরিষ্কার টলটলে নীল পানির ছোট্ট একটা দ্বীপ। চওড়ায় বড়জোর ৪০ ফুট আর লম্বায় আধ মাইল হবে। এত নীল পানি এর আগে শুধু সিনেমাতেই দেখেছি। কিছুক্ষণ কেটে গেল কেবল বুঝতে বুঝতেই যে, স্বপ্ন দেখছি না। ফিন আর ডাইভিং মাস্ক পড়ে পানিতে নামলাম। হাঁটু পানিতেই নানান রঙের হাজার হাজার মাছ ঘুরে বেড়াচ্ছে। এক ভদ্রলোক একটু কলা পানিতে ছুড়ে মারল, মুহূর্তেই কয়েকশ মাছ কলার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। দুই সেকেন্ডেই কলার টুকরা গায়েব। ফারিয়া ওখানেই থাকলো। আমি একটু সামনের দিকে সাতার দিলাম। একটু গভীর পানিতে অসাধারণ দৃশ্য। বড় বড় পাথরের ফাকে ফাকে মাছ ঘুরে বেড়াচ্ছে। সূর্যের আলোয় সব পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। আহা! কেন যে পানিতে ছবি তোলার ক্যামেরা কিনলাম না।







ঘণ্টা খানেক পর রওনা দিলাম। সাগরের মাঝে মাঝে হঠাৎ জেগে উঠা পাথরের পাহাড়ের মাঝে দিয়ে বোট চলছে। দেখে মনে হয় কেউ যেন বিশাল সাগরের মাঝে এলো মেলো করে বেলন আকৃতির পাহাড় গুলোকে বসিয়ে দিয়েছে। নীল পানিতে নানা রঙের পাথরের পাহাড়ের উপর ঘন সবুজ ঘন বন। মাংকি বীচ গিয়ে খুব একটা ভালো লাগলো না। ছোট্ট একটু জায়গায় ৭-৮ টা বোট ভিড়েছে। বাকি গুলো দুরে দাড়িয়ে আছে। বীচ খালি হলে আসবে। মানুষ দাঁড়াবার জায়গা নেই। পালা করে সবাই আসছে, বানরকে বাদাম খাওয়াচ্ছে আর ছবি তুলছে। এত মানুষ মনে হয় মাংকি বীচের বানরও এর আগে দেখেনি। অতি বিস্ময়ে একটা বানর পানিতেই পড়ে গেল। বানর মনে হয় সাতার জানে না। অনেক কষ্টে কোন রকমে একটা পাথরের উপর উঠে বসলো। এই মুহূর্তে গাছে উঠার সামর্থ্য এর নাই।






ফি ফি আইল্যান্ড আসলে একক কোন দ্বীপ না। পাশাপাশি থাকা ফি ফি ডন আর ফি ফি লে নিয়ে ফি ফি আইল্যান্ড। মানকি বীচ আর টনসাই বে ফি ফি ডনের অংশ। অন্য দিকে ভাইকিং কেভ, পিলেহ লেগুণ, লো সামাহ বে আর মায়া বে ফি ফি লের অংশ। মানকি বীচ থেকে ফি ফি ডনের বীচ সাইডে গেলাম বুফে লাঞ্চে। সব টুরের লোকজনকে এখানেই নিয়ে আসা হয় খাবার জন্য। খাওয়া ভালো, বেশ ভালো। সবজি আর মাছ দিয়ে খাবার পর জানলাম মাংস আসলে হালালই ছিল খেতে পারতাম। রেস্টুরেন্টের সবাই মুসলিম। প্রতিটা মেয়ে হিজাব পড়ে আছে। প্রায় প্রতিটা ছেলেই দাড়ি রেখেছে। পরে জেনেছি ফুকেটের এই সব দ্বীপ গুলোর বেশির ভাগ মানুষই মুসলিম। টুর অপারেটরদের বেশির ভাগই তাই। লাঞ্চের পর ছবি তোলার কিছু ব্যর্থ চেষ্টা করলাম। দুপুরের কড়া রোদে কোন ছবিই ভালো আসছে না। ফি ফি ডন দ্বীপটা বেশ সুন্দর। ইংরেজি ইউ আকৃতির তীর ঘেঁষে লম্বা নারকেল গাছের সারি। একপাশে পাহাড় আর তিন পাশে সাগর। ইউ আকৃতির দুটো বীচ (http://www.kohphiphi-don.com/) সাগরকে ভাগ করে দিয়েছে। সুনামিতে দ্বীপটার আকৃতি বেশ বদলে গেছে। সকাল বেলা থাকতে পারলে সবচে সুন্দর ভিউ পাওয়া যেত। দ্বীপে হোটেলও আছে, চাইলে থাকাও যায়।



আমাদের বোটের গাইড একেক স্পটে যাবার পর স্পটের বর্ণনা দিচ্ছে। সেই সাথে কতক্ষণ থাকব তাও বলছে। যদিও তার কথার খুব অল্পই বুঝা যাচ্ছে। একে তো উচ্চারণ ঠিক নাই তার উপর বলছে বেশ দ্রুত। যেমন ফি ফি আইল্যান্ডকে উচ্চারণ করছে পি পি আইলে। ব্যাপারটা মনে হয় সে নিজেও ভালো জানে। বলার সময় একটা বোর্ড ধরে রাখে। যাতে স্পটের নাম আর কতক্ষণ থাকব সেই সময় লিখা থাকে। আমাদের সাথে যারা যাচ্ছে বেশির ভাগই ইউরোপিয়ান। এরাও খুব একটা ইংরেজি জানে না। এদের কিছুই যায় আসে না। নিজেদের ভাষায় টেনে টেনে কথা বলছে।

এরপর গেলাম মায়া বে। লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও দ্যা বীচ মুভি দিয়ে এটাকে বিখ্যাত বানিয়ে ফেলেছে। সেই সাথে ১২ টাও বাজিয়েছে। এত টুরিস্টের চাপ নেবার ক্ষমতা এই বীচের নেই। ইংরেজি আর আকৃতির পাহাড়ের মাঝে ইউ আকৃতির এই বীচটা এখন ফি ফির অন্যতম আকর্ষণ। একদিকে বীচ, বীচের ২ দিকে পাহাড় আর অন্যদিক ফানেলের মত খোলা। বীচটা খুব একটা চওড়া না। পেছনটা পাহাড়ে ঘেরা। পুরোটা দেখতে হেটে বেড়াতে লাগলাম। বা দিকে কাঠের নৌকা রাখা। ডান দিকে স্পিড বোটগুলো। মাঝে সাতার কাটার জন্য ফাকা জায়গা দড়ি দিয়ে ঘিরে রাখা। মানুষজন কেউ সাতার কাটছে। কেউ পাহাড়ের ছায়াতে শুয়ে আছে। আর কেউ কেউ দলবেঁধে ছবি তুলছে। হাতে SLR থাকায় কেউ কেউ ভুলে ফটোগ্রাফার ভাবছে। ক্যামেরা দিচ্ছে ছবি তুলে দিতে। কয়েক তরুণী দলবেঁধে ঘুরতে এসেছে। ক্যামেরা দিল ছবি তুলে দিতে। তোলার পর ভাঙ্গা ইংরেজিতে বলল “Can you take a woo”? আমি কিছুই বুঝলাম না। একজন আকার ইংগিতে পুরোটা বুঝালো। সবাই একসাথে হাত পা ছুড়ে লাফিয়ে উঠবে, সেই ছবি তুলে দিতে হবে। SLR এ স্পোর্ট মুডে সেকেন্ডে ৫-৬ ফ্রেমে সহজেই তুলে ফেলা যায়। কিন্তু Point and shoot ক্যামেরায় ব্যাপারটা বেশ কঠিন। বেশ কয়েক বারের চেষ্টায় ঠিকমত তুলতে পারলাম। তবে একটুও বিরক্ত হইনি। বিকিনি পরা একদল সুন্দরী তরুণী যদি আপনি ready বলার পর বারবার একসাথে লাফিয়ে উঠে, বিরক্ত হবার কিছু নেই।







এরপর লো সামাহ বেতে পৌঁছলাম Snorkelling এর জন্য। চারদিকে খাড়া পাহাড় ঘেরা গোলমত জায়গা। মাথার উপর সূর্য এই বিশাল সুরঙ্গে আলো ফেলছে। মনে হচ্ছে সাগরের মাঝে কোনো গোপন আস্তানায় চলে এসেছি। ফিন আর ডাইভিং মাস্ক পড়ে নেমে পরলাম। খাই নাই দ্বীপে মাছগুলো ছিল বীচের ধারে অল্প পানিতে। আর এখানে গভীর পানিতে। তবে পানি পরিষ্কার থাকায় পুরোটাই দেখা যাচ্ছে। প্রায় ২০-৩০ ফুট পানির নিচে বড় বড় পাথরের গুহায় মাছের কলোনি। দলে দলে বের হচ্ছে কিম্বা ঢুকছে। লাইভ ডিসকভারি চ্যানেল। ডাইভিং মাস্ক পরে থাকায় মাথা পানি থেকে না তুলেও শ্বাস নিতে পারছি। সাতার খুব ভালো জানিনা। কোনো রকমে ভেসে থাকতে পারি। যারা খুব ভালো সাঁতারু, এক ডুবে কলোনির সামনে চলে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ সাতার কেটে হাত পা ছড়িয়ে, পানির নিচে মাথা দিয়ে নিশ্চল ভেসে থাকলাম। অদ্ভুত একটা ব্যাপার ঘটল। সম্ভবত এই টুরের সবচেয়ে চমৎকার সেই সাথে বিস্ময়কর অভিজ্ঞতা। মাছের কলোনি থেকে একটা মাছ উঠে এলো। আমার মাস্কের সামনে এসে বাম চোখের বরাবর তাকিয়ে রইলো। কিছুক্ষণ থেকে আবার ডান চোখের সামনে চলে আসলো। কিছুক্ষণ পর ফুড়ুৎ করে আবার কলোনিতে ঢুকে পড়ল। মাছগুলো নিজদের মত ঘোরাঘুরি করছে। এত মানুষ তারপরও কোন আতংক নেই। কাছে আসছে আবার চলে যাচ্ছে। অনেকটা যেন মানুষের সাথে খেলছে। বোঝা যাচ্ছে কঠিন নিয়ম করে এখানে মাছ শিকার বন্ধ করা আছে।



ফেরার পথে পড়ল ভাইকিং কেভ। সাগরের মাঝে পাহাড়ের গুহায় ভাইকিংদের প্রাচীন আস্তানা। এত চেপ্টা গুহায় এরা থাকত কি ভাবে কে জানে। বোট লেগুণ মারিনা থেকে হোটেলে ফিরতে ফিরতে শেষ বিকেল। হালকা একটা ঘুম দিয়ে সন্ধ্যার পর বের হলাম। পাতং বীচের ফুটপাত ঘুরে বেড়ানো অভ্যাস হয়ে যাচ্ছে। সেই সাথে প্যান কেইক।



Phuket (ফুকেট), Travel log (ট্রাভেল লগ) , , , , , , , , , , , , , , , , , , , No comments