Tag Archive for bangla

ট্রাভেল লগ ৫: ফুকেট ডে ৪ (জেমস বন্ড আইল্যান্ড)

হোটেলের রিসেপসনে বসে আছি। আজকের পিক-আপ ৮ টায়। মিনিট দশেক হাতে আছে। এই ফাকে হোটেলের বেশ কিছু ছবি তুললাম। সকালের আলোয় ছবি সবচেয় ভালো আসে। ভালো কিছু শট পেলাম। শেষ হতে হতেই গাড়ি চলে এসেছে। গন্তব্য পিয়ার। আজকে যাচ্ছি ফাং নাগা বে (Phang Nga Bay)। পিয়ার (Pier) থেকে স্পিড বোটে উঠবো। যাবার পথের রাস্তাটা আনারস বাগানের মধ্যে দিয়ে। দু-পাশে সারি সারি আনারস ধরে আছে। পিয়ারে যাবার পর জামায় কালকের মতই স্টিকার লাগিয়ে দিল। টনি (Tony) লিখা গোলাপি রঙের স্টিকার। কারণ আমাদের গাইডের নাম টনি। জিগ্যেস করলো কোন দেশের। বাংলাদেশ শুনে সালাম দিল। পিয়ার বোট লেগুণ মারিনার মত না। লেগুণ থেকেই স্পিড বোটে উঠা যায় না। পিয়ার থেকে স্পীড বোট পর্যন্ত প্রায় আধা মাইল। লম্বা একটা জেটি ধরে হেটে বা ভ্যানে যেতে হয়। একটা ভ্যানে করে কিছু মানুষ গেল। আমরা বাকিরা হেটেই গেলাম। এই স্পিড বোট কালকের মত না। আরো বড় আর একটু পুরনো। কোনও সিট নেই। বোটের চারপাশে বেঞ্চের মত জায়গায় সবাই বসে। প্রথমে যাচ্ছি জেমস বন্ড আইল্যান্ড।



যাবার পথটা কালকের মতই। সাগরের মাঝে খন্ড খন্ড পাহাড়। মাঝে একটা জায়গায় একদল চিল চোখে পড়ল। আমাদের বোট ঘিরে চক্কর খেতে থাকলো। কাছেই হিত ওদের ডেরা। জেমস বন্ডে পৌঁছে বোট থেকে নামলাম। চিকন একটা কনক্রিটের করিডোর দিয়ে হেটে যেতে হবে বাম দিকে। তার পর দিনে মোড় নিয়ে সোজা এগোলেই চোখে পড়ে অন্য রকম দুটো পাহাড়। দুটো পাহাড়ের পাশাপাশি আর পুরোপুরি সমতল দুই পাশ প্রায় ৩০ ডিগ্রী কোনে আর শখানেক ফুট উপরে একে অপরের সাথে হেলান দিয়ে লেগে আছে। প্রাকৃতিক কোনও পাহাড়ের পাশ এতটা সমতল কখনো দেখিনি। জেমস বন্ড দ্বীপটার আসল নাম না, আসল নাম খাও ফিং কান (Khao Phing Kan)। যার মানে হচ্ছে: “Hills leaning against each other”। হয়ত এই আজব পাহাড়ের কারণেই এই নাম। ১৯৭৪ সালে মুক্তি পাওয়া জেমস বন্ডের ম্যান উইথ দ্যা গোল্ডেন গান ছবির শুটিং হয়েছিল এখানে। তারপর থেকে খাও ফিং কান নামটা হারিয়ে যাচ্ছে।

খাও ফিং কান

একটু সামনে এগুতেই পড়ল বিখ্যাত জমস বন্ড রক। প্রায় গোল করে ঘিরে রাখা সাগরের পানির ঠিক কেন্দ্রে বেলন আকৃতির এক খন্ড পাথর। যার নিচের অংশটা সরু হয়ে সাগরে মিশেছে। যদিও পাথরটার আসল নামে কো তাপু (Ko Tapu)। নামটা এখন স্থানীয় লোকজনও ভুলতে বসেছে। এটা দেখার পর যে কারো মনে হবে জেমস ক্যামেরন এভাটার মুভির ফ্লোটিং মাউন্টেনের আইডিয়া এখান থেকেই মেরেছেন। হয়ত আসলেই তাই।

কো তাপু
কো তাপু
কো তাপু

মানুষজন এই রকে হেলান দেবার ভঙ্গিতে দাড়িয়ে জেমস বন্ডের মত দাড়িয়ে ছবি তুলছে। হাতে অদৃশ্য পিস্তল। দেখতে ভালই লাগছে। ডান দিকে বাঁশ আর শনের তৈরি সুভেনির মার্কেট। বাম দিকে সরু পাহাড়ের উঠার রাস্তা। বেশ খানিকটা উঠলে রকটার ভালো কিছু ভিউ পাওয়া যায়। ছবি তোলার জন্য ভালো জায়গা। যদিও পাথরের সিরির মত উপরে উঠার রাস্তাটা মোটেও সুবিধার না। বেশ চাপা, পাশাপাশি দুজন দাঁড়ানো যায় না। তার উপর ঝরনার পানিতে ভেজা। বেশ ভয়ে ভয়ে উঠলাম। না আবার পা পিছলে পরি। এখান থেকে জেমস বন্ড রকের আরেকটা ভিউ পাওয়া যায়। উপরে উঠে বড় একটা পাথরের উপর অল্প একটু দাঁড়ানোর জায়গা। এক দম্পতি এসেছে দুই টিনেজার মেয়েকে নিয়ে। উদ্দেশ্য বিকিনি ফটোসেশান। যথেষ্ট সময় নিয়ে ফটোসেশান হচ্ছে। সিরিতে লম্বা লাইন পড়ে গেছে। এরা সরার নাম করছে না। এত কঠিন পথ পারি দিয়ে এসেছে, এত জলদি সরার কথাও না।

সুভেনির মার্কেট

ছবি তোলা নিয়া মহা ঝামেলার মধ্যে পরেছি। গতকাল মায়া বে তে গিয়ে পড়েছিলাম এক ঝামেলায়। আমার স্ত্রীর নাকি অনেক দিনের শখ বীচের ঠিক মাঝে, সাগরের সামনে দাড়িয়ে আমাদের দুজনের ছবি তোলা। শুধু মাঝে দাঁড়ালেই চলবে না। আমাদের বাম আর ডান দিকের পাহাড়ের মাঝে যেই ফাকা জায়গাটা আকাশ আর সাগর ভাগাভাগি করে নিয়েছে, আমরা দাড়িয়ে থাকব সেখানে। এছাড়া আমাদের মাথার উপর পাহাড়ের চূড়া আর পায়ের নিচে বীচের ধবধবে সাদা বালি থাকলেই চলবে। সমস্যা হচ্ছে ব্যাপারটা ও আমাকে আগে বলেনি তার উপর আমি tripod হোটেলে ফেলে এসেছি। কাউকে দিয়ে বড়জোর ছবি তোলানো যায় কিন্তু এরকম জটিল জ্যামিতিক সমীকরণের ছবি তোলানো প্রায় অসম্ভব। তাও যদি ওরা ভালো ইংরাজি বুঝত। কপাল বেশ ভালো ছিল বলতে হবে। ঢাকা থেকে আসা এক ভদ্রলোককে পেয়ে গিয়েছিলাম। মিনিট খানেক বুঝিয়ে ছবিটা তোলা গেছে। কিন্তু আজকে পরলাম আরো বড় সমস্যায়। আজও ভোরে বের হতে হবে বলে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়েছি। আবার সকালে উঠেই বের হয়ে গেছি। তারাহুরোর মাঝে ক্যামেরা চার্জ দিতে ভুলে গেছি। জেমস বন্ড আইল্যান্ডে পৌঁছানোর পরই ক্যামেরা লো ব্যাটারির সাইন দিচ্ছে। মনে হচ্ছে পুরো দুই সপ্তা ক্লাস বাং মেরে হাজির হবার পর শুনছি আজকে মিড-টার্ম। ফ্যাকাল্টিও সুবিধার না। মেক-আপ নেবে না।

বোটে উঠার সাথে সাথেই চার্জ শেষ। অনেকের সাথেই DSLR আছে। কারো কারো সাথে চার্জারও থাকতে পারে। জিজ্ঞেস করা শুরু করলাম। ভাগ্য এবারও বেশ ভালই বলতে হবে। আমাদের সাথে ক্রোয়েশিয়ার এক দম্পতি যাচ্ছে। ওদের ক্যামেরাও Canon 500D। কি জন্য খুঁজছি শুনল। ভদ্রলোকের কাছে চার্জার না থাকলেও এক্সট্রা ব্যাটারি আছে। ওটাই দিয়ে দিল।

তারপর গেলাম Panyee Island। একটা মুসলিম গ্রাম। সাগরের মাঝে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন। একটা বড় পাহাড় ঘিরে গ্রামটা। পুরোটাই কাঠের পাটাতনের উপর। এমন না যে পানির অনেক উপরে। যেকোনো বড় জোয়ারে গ্রামটা নিশ্চিত ভাবেই ডুবে যায়। পুরো গ্রামটা ঘুরে দেখালাম। বড় একটা বস্তি বলা চলে। মানুষজন বেশ গরিব, সেই সাথে ধার্মিকও। বয়স্ক পুরুষেরা সবাই টুপি পড়ে আছে। কোন দোকানে কেউ মদ বা বিয়ার বিক্রি করে না। গ্রামের মাঝে বড় উঠানের পাশে একটা স্কুল। একটা ক্লাসে টিচার নেই। টুরিস্ট দেখে ক্লাসের বাচ্চাগুলো আমাদের দিকে ফিরে, জানালা দিয়ে Michael Jackson এর নাচের ভঙ্গিতে পোজ দিচ্ছে। ইংরেজি এস-এর মত শরীর বাকিয়ে, ডান হাত শরীরের সাথে ৪৫ ডিগ্রি কোনে, বাম হাত প্যান্টের বেল্টে। পিচ্ছিগুলো স্টাইলটা ঠিক মত ধরতে পারেনি। বাম হাত দিয়ে প্যান্টের জিপার খামচে ধরে আছে। মোটামুটি অশ্লীল ভঙ্গি।

Panyee Island
উঠানের পাশে স্কুল

দুপুরে Hong Island। লম্বা সময় এখানে কাটাব। প্রথমে লাঞ্চ, তারপর canoeing। সাগরের মাঝে বড় একটা লঞ্চের ডেকে খাবার ব্যবস্থা। খাবার পর লঞ্চের পেছন থেকে canoeing-এর নৌকায় উঠলাম। প্রতি নৌকায় ২/৩ জন করে। নৌকার মাঝি মজার মানুষ। অল্প বয়সী একটা ছেলে। বয়স বড়জোর ১৫-১৬ হবে। চেহারায় কঠিন জীবিকার ছাপ। ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংরেজিতে অনর্গল কথা বলে যাচ্ছে। চিকন একটা টানেলের মত প্রবেশ পথ দিয়ে গুহার ভিতর ঢুকলাম। নৌকায় বসেও মাথা নিচু করে ঢুকতে হয়। মাথার উপর এবড়ো থেবড়ো চোখা পাথর। একটু খোঁচা লাগলেই নিশ্চিত রক্তারক্তি। গুহার ভেতরটা অদ্ভুত, অদ্ভুত রকম সুন্দর। পাহাড়ের ভিতর গোলাকার একটা ফাকা জায়গা। মাথার উপর দিয়ে সরাসরি আকাশ দেখা যাচ্ছে না। তবে রোদের আলো ভালই আসছে। আলোর প্রতিফলনে পুরো জায়গাটা আলোকিত হয়ে আছে। মনে হচ্ছে আরেক পৃথিবীতে চলে এসেছি এক টানে। আলোর এমন খেলা এর আগে নিজের চোখে দেখিনি। বর্ণনা করার সামর্থ্য আমার নেই। দুঃখিত।

canoeing

Naka Island যাবার সময় Panak Island পাশ দিয়ে গেলাম। পাহাড়ে অনেক প্রাচীন গুহা। যেমনটা গতকালও দেখেছি। Naka Island-এ ঘণ্টা দুয়েক সময় কাটান। চমৎকার নিলো পানি আরে সাদা বালির সৈকত। তেমন ভিড়ও নেই। সৈকতে গাছের ছায়ায় সারিসারি কাঠের খাট পিছান। তবে একটা ভাড়া করা যাবেনা। জোড়া খাট ঘণ্টা প্রতি ভাড়া। যারা একলা ঘুরবে তাদেরও দুইটা ভাড়া নিতে হবে। একটা থাই নৌকা নোঙ্গর করা। বেশ সুন্দর দেখতে, আগে একটা ছবি তুলে নিলাম। ঘণ্টা খানেক সাতার কাটলাম। তারপর কাঠের খাটের উপর আয়েশ করে শুয়ে থাকা। আহা! কি আনন্দ!

Naka Island
থাই নৌকা

পিয়ারে ফিরতে ১০ মিনিটও লাগলনা। গাড়িতে করে হোটেলে পৌঁছে ছোট একটা ঘুম। রাতে শেষ বারের মত পাতং বীচ দেখতে বের হলাম। চার দিন কেটে গেছে টানের উপর। টেরও পাইনি। খুব বেশি ঘুরাঘুরি করলাম না। ভোর ৪ টায় বের হতে হবে ঠিক ৭ টায় ফ্লাইট। ভোরের অন্ধকারে এয়ারপোর্ট যাবার সময় বুঝলাম, কতটা যত্ন পায় এই বীচ। এই অন্ধকারে ঘষেমেজে রাস্তাঘাট পরিষ্কার করছে মানুষজন। আবছা আলোয় শেষ বারের মত আরেকবার দেখে নিলাম বীচটা। Good bye Patong, Hope to see you again………



Phuket (ফুকেট), Travel log (ট্রাভেল লগ) , , , , , , , , , , , , , , , , , , No comments

ট্রাভেল লগ ৩: ফুকেট ডে ২

পাতং বীচের বেঞ্চে বসে সূর্যাস্ত দেখলাম। মনে রাখার মত কিছু মনে হইনি। সন্ধ্যার পর অন্ধকার বীচে বসে থাকার মানে হয়না। ফিরে এসে Coffee World এ কফি খেলাম। স্বাদ পুরোপুরি ঢাকারটার মতই। বীচের পাশের ফুটপাত ঘেঁষে চওড়া one-way রোডটার নাম পাতং রোড। পাতং রোডের ফুটপাত ধরে হাঁটছি। পাতং Night Life সত্যিই দেখার মত। চারপাশে বেশ happening একটা ভাব। কিছু করার না থাকলে চুপচাপ ফুটপাত ধরে হাটতে থাকুন এমনিতেই ভালো লাগবে। রাস্তার ধারের রেস্টুরেন্ট আর বার গুলোতে গান হচ্ছে। কিছু পারফর্মারের গলা সত্যিই চমকে দেবার মত। এক সিঙ্গার Michael Jackson এর Billie Jean গাইছিল। কিছুক্ষণ না শুনলে বোঝাই যায় না যে এটা Michael Jackson না। রেস্টুরেন্টের সামনে বরফে আর একুরিয়ামে মাছ, চিংড়ি আর লবস্টার সাজানো। সাথে price tag দেয়া। আপনি যেটা পছন্দ করবেন তখনই ভেজে অথবা রান্না করে দেবে। রান্না করা চিংড়ি, লবস্টার দেখলে হয়ত খেতে ইচ্ছে হয়। কিন্তু একুরিয়ামে বিকট দর্শন লবস্টার আর চিংড়ি হেটে যেতে দেখলে খাবার ইচ্ছা এমনিতেই উবে যায়। আমিও আর দাঁড়ালাম না, ছবি তুলে হাটা দিলাম।

পাতং রোড জমে উঠে সন্ধ্যার পর থেকে। রাস্তার পাশে ভ্যান গাড়ির উপর বসে খুচরা খাবার দোকান। জুস, বিয়ার থেকে শুরু করে প্যান কেইক। প্যান কেইকের স্বাদ অবিশ্বাস্য। আমি জীবনে এত মজার প্যান কেইক খাইনি। প্রায় ১০-১৫ রকমের প্যান কেইক বিক্রি হয়। দাম ৩৫-৫০ বাথের মধ্যে। লাইন ধরে দাড়িয়ে অর্ডার দিতে হয়। আপনার সামনেই বানিয়ে দেবে। প্যান কেইক বানানোও দেখার মত। তাওয়াতে ময়দার কাই ঢালবে। হাতুড়ির মত একটা কাঠি দিয়ে তাওয়াতে ছড়িয়ে দেবে। তারপর আপনার চাহিদা মত nautilla, কলা বা অন্য ফলের লেয়ার দেবে। কায়দা মত ভাগ করে বানাবে। তারপর মোগলাইয়ের মত টুকরা করে পেপার প্লেটে তুলে দেবে। টুথপিক দিয়ে তুলে তুলে খাবেন। রাতের হালকা ডিনার হিসাবে এরচেয়ে ভালো কিছু সম্ভব না।

হাটতে হাটতে টুক-টুকের অদ্ভুত শব্দ শুনবেন। টুক-টুক হচ্ছে ওদের লোকাল ট্রান্সপোর্ট। অনেকটা আমাদের Maxi বা Raider এর মত। চলার সময় ভেতরে উচ্চ শব্দে মিউজিক চলে। টুরিস্টদের মনে হয় এই জন্যই ভীষণ পছন্দ। টুক-টুক শব্দ করে চলে বলে নাম টুক-টুক। ৮-১০ জন মিলে কোথাও যাবার জন্য এগুলোর ভাড়া মাত্র ৮০০ বাথ। সবচেয় ভালো হচ্ছে যদি আপনার বাইক চালানোর লাইসেন্স থাকে। ৩০০-৬০০ বাথ দিয়ে সারাদিন ঘুরতে পারবেন। ভাড়া দেবার জন্য পাতং রোডের পাশে বিভিন্ন স্ট্যান্ডে শয়ে শয়ে বাইক রাখা আছে টুরিস্টদের জন্য। আর যে জিনিসটা নিশ্চিত ভাবেই আপনার নজর কাড়বে তা হচ্ছে ওদের kick boxing এর বিজ্ঞাপন। অনেকটা বাংলা সিনেমার বিজ্ঞাপনের মতই উচ্চস্বরে মাইক বাজিয়ে চলবে।

যে গলিগুলো সরাসরি পাতং রোডে গিয়ে মিশেছে। সেগুলোও সরগরম। স্ট্রীট মার্কেট, বার, ডিস্কো, স্পা আর ফুট মাসাজ গুলোর বেশির ভাগ এইসব গলিতেই। আমাদের হোটেল থেকে বামে গেলেই বিখ্যাত বাংলা রোড। আরেকটু এগোলে বানানা ডিস্কো। তবে রাত ১০ টার আগে ডিস্কো ওপেন হয়না। শুধু ফুকেট নয়, থাইল্যান্ডে গেলে যে জিনিসটা অবশ্যই মিস করা উচিত না তা হচ্ছে ফুট-মাসাজ। সারাদিন হেটে পায়ে ব্যথা বানাবেন তারপর হোটেলে ফেরার আগে ফুট-মাসাজ। জিনিসটাকে ওরা মোটামুটি শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছে। মাসাজও করবে মোটামুটি কেতাবি কায়দায়। প্রথমে গরম পানিতে পা ধোয়াবে। তারপর মাসাজ ওয়েল মাখবে। আমাদের দেশে হাত-পা টেপার সময় আঙ্গুলের ডগা ব্যবহার হয়। ওদের ধরন আলাদা। হাত মুঠ করে আঙ্গুলের মাঝের হাড় দিয়ে চাপ দেবে। মাঝে মাঝে একটা পেন্সিলের মত কাঠ দিয়ে পায়ের আঙ্গুলের জায়গায় জায়গায় চাপ দেয়া হবে। এক পায়ে মাসাজের সময় আরেক পা গরম তোয়ালে জড়িয়ে রাখবে। ফুট-মাসাজের সময় ঘুমিয়ে পড়ার সম্ভাবনা শতকরা ৮০ ভাগ। এক ঘণ্টার ফুট-মাসাজ ২৫০-৩০০ বাথ। তবে মাসাজের পর পা ব্যথা ভুলে যাবেন।

সকাল সকাল উঠবো দেখে, তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পরলাম। তবে ভোরে উঠা হয়নি। উঠতে উঠতে ১০ টা। হালকা নাস্তার পর সোজা বীচে। উদ্দেশ্য প্যারা-সেইলিং। দাম দর করে প্রতিজনের ১০০০ বাথ করে। লাইনে দাড়িয়ে আছি। আমার আগে ফারিয়া যাবে। আমি ভিডিও করব। ওর আগে এক ইন্ডিয়ান মহিলা তৈরি হচ্ছে। সারা গায়ে প্যারাসুটের সাপোর্ট বাধা হচ্ছে। তৈরি হবার পর স্পিড বোট দিয়ে টেনে উপরে তোলা হবে। স্পিড বোট টান দিলে মহিলাকে দৌড়াতে বলা হলো। কিন্তু টান দেবার পর উনি তাল সামলাতে পারলেন না। হোঁচট খেয়ে পানিতে পড়ে গেলেন। ভদ্র মহিলার স্বামী রেগে গিয়ে চিৎকার শুরু করলেন। তিনি প্যারা-সেইলিং করাবেন না। ভদ্রলোক খাটি পাঞ্জাবি। একদম হিন্দি সিনেমার ভাল্লে ভাল্লে টাইপ। মাথায় পাগড়ি পড়েছেন, সেই সাথে টাইট টি-শার্ট। যার কারণে ভুঁড়িটা শরীর থেকে একহাত সামনে দেখা যাচ্ছে। ভুঁড়ি-ওয়ালা মানুষ সাধারণত ঢিলে-ঢালা কাপড় পড়ে যাতে ভুঁড়ি কম বোঝা যায়। এরা ঠিক তার উল্টো। মনে হয় চতুর্দশ শতাব্দীর স্পেনের রাজাদের মত। ভুঁড়ি অভিজাত্যের প্রতীক। যাদের ভুঁড়ি ছিলনা ওরা পেটে বালিশ বেধে দরবারে যেতেন।

আমার আগে ফারিয়া গেল। উঠা থেকে শুরু করে নামা পর্যন্ত পুরোটাই ভিডিও করলাম। টেনে উপরে উঠানোর পর স্পিড বোট থেকে যায়। তারপর আস্তে আস্তে পানিতে পড়ে যায়। পানি থেকে স্পিড বোটে তুলে বীচে নিয়ে আসা হয়। আমি শুরু করার আগে ক্যামেরা ফারিয়ার হাতে দিয়ে গেলাম। ও আমারটাও পুরো ভিডিও করলো। তবে ছোট্ট একটা ভুল করে ফেলল। আমি শুরু করার সময় ও রেকর্ডিং অফ করেছে, আর নেমে আসার পর অন করেছে। এছাড়া বাকি সব ঠিক আছে।

ফারিয়ার প্যারা-সেইলিং

পানিতে সাতার কাটার জন্য দড়ি দিয়ে আলাদা জায়গা করা আছে। বাইক আর স্পিড বোট এর মধ্যে ঢুকে না। একটা জায়গায় প্লাস্টিকের আইস-বার্গ, জাম্পিং টিউব আছে। প্রতি ঘণ্টা মাত্র ৩০০ বাথ। না জেনে উঠে পড়েছিলাম। চোখে পড়া মাত্র কেটে পরেছি। লাঞ্চ করতে আজকে আরেকটা রেস্টুরেন্টে গেলাম। ফারিয়া টমিয়াম সুপ খাবে। জিগ্যেস করলাম এক বাটি কয়জন খায়, বলল ১:১। সার্ভ করার পর দেখি, মাটির বড় মালসায় করে নিয়ে এসেছে। পানি কম কালামারিন, চিংড়ি আর স্কুইডের পরিমাণই বেশি। সুপ খাবার পর দেখি একজন না দুইজনের পেটই পুরো ভোরে গেল।



Phuket (ফুকেট), Travel log (ট্রাভেল লগ) , , , , , , , , , , , , , , , , , No comments

ট্রাভেল লগ ২: ফুকেট ডে ১

সকাল ৬.৩০ টা। মালয়েশিয়ায় আমার প্রথম এবং সংক্ষিপ্ততম ভ্রমণ শেষে ফুকেটের প্লেনে উঠেছি। শরীর জানান দিচ্ছে, আমার সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডে সে মোটেও খুশি না। মাত্র ২২ বছর বয়সেই আমি ব্যাক পেইন বাধিয়েছি। দিনে দিনে অবস্থা আরো খারাপ হচ্ছে। শরীর ঠিক রাখতে আমাকে কঠিন কিছু নিয়ম মানতে হয়। প্রতিদিন কমপক্ষে ৬-৭ ঘণ্টা ঘুম, সকাল-বিকাল পিঠের স্ট্রেচিং, নিয়মিত সাতার কাটা, শক্ত জায়গায় বেশিক্ষণ না বসা, রিক্সায় একেবারেই না ওঠা। ঘাড়ের নিচ থেকে কোমর পর্যন্ত হালকা জালা শুরু হয়েছে। রাতে ঘুম হয়নি, খুব ঘুম পাচ্ছে কিন্তু ঘুমাতে পারছিনা। কপাল ভালো ফ্লাইট মাত্র ১ ঘণ্টার।

যাবার আগে ফুকেটের উপর বেশ কিছু ব্লগ পড়েছিলাম।যারা আমাদের মত বাজেট ট্রিপ দেবেন তাদের অবশ্যই পড়া উচিত। বর্ণনা চমৎকার। কোনো কিছু খুঁজে পেতে তেমন সমস্যা হয় না। এয়ারপোর্ট থেকে বেড়িয়ে সোজা ট্যাক্সি সার্ভিস, ভাড়া ৬০০ বাথ। বাম দিকে গেলে এসি মাইক্রো বাস সার্ভিস, ভাড়া জনপ্রতি ১৫০ বাথ। আপনাকে একবারে হোটেলের দরজায় নামাবে। ডলার ভাঙ্গাতে চাইলে বাম দিকে bank authorized money exchange আছে। exchange rate যথেষ্ট ভালো। মাইক্রো বাসে আমার পাশে এক ভদ্রলোক বসেছে। বেশ আলাপী মানুষ। হোটেল পর্যন্ত যেতে যেতে থাইল্যান্ড আর ফুকেট নিয়ে অনেক কিছু জানালেন। থাইল্যান্ডে নাকি অনেক গুলো রাজা ছিল। মানুষ যেই রাজাকে পছন্দ করে ঘরে তার ছবি ঝুলিয়ে রাখে। যখন তার জনপ্রিয়তা কমে যায়, তার আগের জনের ছবি ঝুলিয়ে দেয়। কথাটা সত্যি কিনা জানতে পারিনি। আমরা হোটেল বুক করে বেড়াতে এসেছি শুনে অবাক হলো। এখানে নাকি সব সিজনে প্রায় সব হোটেলেই রুম পাওয়া যায়। এটাও সত্যি কিনা জানিনা।

ফুকেট থাইল্যান্ডের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন দ্বীপ। ৫৪৩ বর্গ কিলোমিটারের এই দ্বীপের বর্তমান মূল আকর্ষণ এর বীচ আর চারপাশে ছড়িয়ে থাকা ছোট ছোট দ্বীপ গুলো। সবচেয়ে জনপ্রিয় দুটো হচ্ছে পাতং আর কাটা বীচ। কোনো বীচই খুব একটা বড় না। আমাদের কক্সবাজার সেই তুলনায় স্বপ্নের মত। অর্ধচন্দ্র বীচগুলো গায়ে গায়ে লাগানো। বীচ ঘেঁষে কনক্রিটের চওড়া ফুটপাথ। তারপর রাস্তা। রাস্তা ঘেঁষে হোটেলগুলো সার বেধে দাঁড়ানো। আমাদের হোটেলটা পাতং বীচের ঠিক মাঝামাঝি। সাফারি বীচ হোটেল। ব্লগগুলোর রেটিং অনুসারে এটাই পাতং এর সেরা বাজেট হোটেল। হোটেলটা ২ ভাগে ভাগ করা। একটা বীচের পাশে আরেকটা পেছনে। তবে হোটেলটা জনপ্রিয় এর একটা রেস্টুরেন্টের কারণে। সেভয় সীফুড রেস্টুরেন্ট। আমি ফুকেটে ৪ দিন ছিলাম। আর কোথাও একসাথে এত গুলো দামী গাড়ি পার্ক করা দেখিনি, যতটা দেখেছি সেভয় সীফুডের সামনে। সবচেয়ে বেশি যে গাড়িটা পার্ক করা দেখেছি তার ব্র্যান্ড জাগুয়ার।

শুধু বাঙালির ইংরেজির অবস্থাই খারাপ না, অনেকেরটাই খারাপ।এটা বোঝার জন্য থাইল্যান্ড চমৎকার জায়গা। চেকইনের পর receptionist কে জিজ্ঞেস করলাম “Do you have any locker service here?”। সে আমাকে wifi username আর password এর কার্ড ধরিয়ে দিয়ে থাই ভঙ্গিতে অভিবাদন জানালো। রুমে ঢুকেই মন ভালো হয়ে গেল। এত কম ভাঁড়াতে এত বড় রুম পাওয়া যাবে কল্পনাও করিনি। রুমের সাথের বারান্দাটাও সুন্দর। দুটো চেয়ার আর একটা টেবিল পাতা আছে। পর্দা সরিয়ে sliding door খুলে দিলে ওটাও রুমের অংস মনে হয়। রুমে মিনি ফ্রিজ, লকার সবই আছে। যদিও নেটে ছবি ছিল, ওগুলোতে বিশ্বাস করা বেশ বোকামি।

এখন বাজে সকাল ১০ টা। এই রোদে বের হবার মানে হয়না, তার উপর সারারাত ঘুমাইনি। শাওয়ার নিয়ে সোজা ঘুম। ঘুম থকে উঠলাম ৩ টায়। বিয়ের পর কোনো পুরুষই তৈরি হওয়া মাত্র বের হতে পারে না। বউ এর রেডি হবার জন্য অনির্দিষ্ট সময় ধরে, অত্যন্ত ধৈর্য নিয়ে অপেক্ষা করতে হয়। আমি অপেক্ষা করছি। হোটেল থেকে বেড়িয়ে ফুটপাথে দাড়িয়ে কোথায় খেতে যাব ভাবছি। নতুন জায়গা কিছুই চিনি না। সুতরাং চিন্তা করেও লাভ নেই। ডান দিকে হাটা দিলাম। রেস্টুরেন্ট গুলোর বাইরের স্ট্যান্ডে মেনু দেয়া আছে। ২/৩ টা দেখে সাহস করে একটায় ঢুকে পরলাম। নাম “Current of the sea”। হোটেলের নিচে রেস্টুরেন্ট। জায়গাটা চমৎকার। পুরো প্লাটফর্মটা বানানো হয়েছে একটা সুন্দর সুইমিং পুলের ৩ দিক ঘিরে। আরেক দিকে বীচ। নিচ তলার এক পাশে খাবার রেস্টুরেন্ট। টেবিলগুলো পুলের এক পাশে। বাকি ২ দিকে থাকার ঘর। কেউ চাইলে রুম থেকেই লাফিয়ে পুলে ঝাপ দিতে পারবে।

খাবার দাবারের ব্যাপারে আমি পুরোপুরি কট্টরপন্থী। অমুসলিম দেশে মাছ আর সবজির বাইরে কিছুই খাই না। থাইল্যান্ডের সী-ফুড বিখ্যাত। যে চার দিন থাকছি, সী-ফুডের বাইরে অন্য কিছু খাবার ইচ্ছাও নেই। একটা সালাদ আর কার্রী অর্ডার দিলাম, সাথে জুস। খাবার অসাধারণ। সবচে ভালো লাগে পরিমাণ দেখে। ডেকোরেশনও চোখে পরার মত। সালার দিয়েছে বাঁধাকপির খোলের ভিতর। শসার ভেতর লেটুস পাতা ভরে ফুলদানির মত বানানো। ওদের খাবারের অনন্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে শুটকি দিয়ে তৈরি করা এক ধরনের সসের গন্ধ আর অর্ধ-সিদ্ধ উপকরণ। যাদের শুটকি ভালো লাগে না তাদেরও খেতে খারাপ লাগবে না। ফ্রুট জুস মানে যে পানি মেশানো চিনির রস না, আমরা বাংলাদেশিরা অনেক আগেই ভুলে গেছি।

খাবার পর বীচে হাটতে বের হলাম। মোটামুটি সরগরম অবস্থা। বীচের জায়গায় জায়গায় প্যারা-সেইলিং হচ্ছে, কেউ জগিং এ বের হয়েছে তো কেউ সী-বাইকে সাগরে ঘুরছে। তবে বেশির ভাগ মানুষ শুয়ে শুয়ে রোদ পোহাচ্ছে চামড়া কালো করার জন্য। আমার চামড়া এমনিতেই কালো। আমার রোদ পোহানোর দরকার নাই। আমি ঘুরে ঘুরে পুরোটা দেখতে লাগলাম। আমার স্ত্রী যেকোনো জায়গায় ছবি তোলার জন্য দু-পায়ে খাড়া। ওর ছবি তুলছি। আসার সময় যেহেতু বেশ কজন ফুকেতে বেড়াতে আসা মানুষ (বিশেষ পোশাকে) জনের ছবি নিয়ে যাবার সবিনয় অনুরোধ করেছে, তাই অনেক ছবিতেই ও অফ-ফোকাস হয়ে যাচ্ছে। অবশ্য এ ব্যাপারে আমার নিজের আগ্রহও খুব একটা কম দেখলাম না। দৃশ্য চমৎকার। মানুষ অবশ্যই সৃষ্টির সেরা, সেই সাথে সুন্দর জীব।



Phuket (ফুকেট), Travel log (ট্রাভেল লগ) , , , , , , , , , , , , No comments